উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত

চুক্তি সইয়ে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র্র-ইরান

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে’ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতার পর গত রবিবার ওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তির ঘোষণাটি নিশ্চিত করেছে। আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এ চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো, গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ-পরিসর বাড়ানো। এর আওতায় আরও ৬০ দিন কোনো ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর অঙ্গীকার এখানে আছে। বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে। আর ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। 

ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দুই পক্ষ আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্বনেতারা।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই চুক্তিতে যে ১৪ বিষয় থাকছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী- লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি; ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি; ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার; ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার; ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া; যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেবে, যাতে ব্যয় হবে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার; ইরানের তেল ও জ¦ালানি পণ্যের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার অবসান; পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বার্তা সংস্থা মেহরের খবরে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ করা ইরানের তহবিলের অর্ধেক না ছাড়া, ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত যে চুক্তি হবে, সেটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে অনুমোদিত হবে। ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। তিনি আরও লেখেন, তেল প্রবাহিত হতে দিন। ট্রাম্পের মতে- যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার বিপরীতে তিনি এক ‘দারুণ চুক্তি’ সম্পন্ন করেছেন, যা পুরো অঞ্চলে ‘শান্তি ও নিরাপত্তা’ নিয়ে আসবে।

বহুল প্রতীক্ষিত এ চুক্তিকে বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এ অগ্রগতিকে বজায় রাখতে এবং অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের শীর্ষ চার শক্তিযুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি। চার দেশের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। কাতার, তুরস্ক, জাপান, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ এ সমঝোতাকে ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক নতুন দিগন্ত বলে অভিহিত করেছে।

এদিকে, প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তের ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গতকাল সোমবার তেলের দাম কমে গত মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। লন্ডন সময় সোমবার প্রথম প্রহরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৩.৫৮ ডলার বা ৪ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ৮৩.৭৫ ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ব্যারেল প্রতি ৪.০১ ডলার বা ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮০.৮৭ ডলারে।