টাকা গেল, মশা রইল

গতবারের চেয়ে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জরিপেও ডেঙ্গু ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। অথচ এ রোগের বাহক মশা গিলে খাচ্ছে সরকারের শত শত কোটি টাকা। গত ১০ বছরে মশার পেছনে অন্তত হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের। কিন্তু টাকা উড়িয়েও কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না সংস্থা দুটি। সরকার বদলায়, মেয়র বা প্রশাসক বদলায় শুধু বদলায় না ডেঙ্গু পরিস্থিতি।

গত বছর মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন মানুষ। এর মধ্যে মারা যান ৪১৩ জন, যার ৬৫ শতাংশই ঢাকা মহানগরীর। এ বছর গত ৭ জুন পর্যন্ত ৭১১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের, এর মধ্যে দুজন রাজধানীর।

জানা গেছে, একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে মশক নিধনে খুবই সামান্য বাজেট থাকত। এই বাজেট বাড়তে বাড়তে ১০ বছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু মশক নিধনের কোনো উন্নতি হয়নি। ড্রেনে গাপ্পি ও তেলাপিয়া মাছ চাষ, ব্যাঙ চাষ, লেকে হাঁস ছাড়া; এমনকি ড্রোন উড়িয়েও মশক নিধনের ব্যর্থ চেষ্টার পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। তা ছাড়া লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইডের সনাতন পদ্ধতির সঙ্গে বিটিআই নামক ওষুধ আমদানির নামেও ভয়াবহ প্রতারণা প্রত্যক্ষ করেছেন নাগরিকরা।

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন বলেন, ‘এবার ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের রক্তক্ষরণেরও আশঙ্কা রয়েছে। ডাক্তাররা আশঙ্কা করছেন, এবারের ডেঙ্গুর রূপ হবে ভয়াবহ। যার নাম হেমোরোজিক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে হতে পারে রক্তক্ষরণও। সুতরাং আগে থেকেই সচেতন হতে হবে।’ গত ৬ জুন ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এবার ডেঙ্গুর পূর্বাভাস নিয়ে প্রাক-বর্ষা জরিপ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। জরিপে ডিএসসিসি এলাকায় অন্তত ৮৪ শতাংশ ওয়ার্ড ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অর্ধেকের বেশি ওয়ার্ড ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিএনসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ জরিপে ঢাকা উত্তরের অনেক ওয়ার্ডে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে সাড়ে তিনগুণ বেশি এডিস মশার ঘনত্ব পাওয়া গেছে।

এদিকে সংস্থাটি দুটি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে ইতিমধ্যেই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। এতে নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে তারা। গত ৭ জুন থেকেই মশক নিধনের বিশেষ ক্র্যাশ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর আগে মশার উৎস খুঁজে বের করতে এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় একাধিক কমিটিও করেছে সংস্থা দুটি।

দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ছাড়াও সকাল-বিকেল পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি মশক নিধনে প্রায় ২ হাজার কর্মী কাজ করছেন। মশার লার্ভা ধ্বংসে প্রতিদিন সকালে লিকুইড ওষুধ ছিটানো হয় এবং বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে ম্যালাথিয়ন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং করা হয়। প্রতি ওয়ার্ডে অন্তত ৬ জন করে মশককর্মী কাজ করার কথা। কিন্তু মেয়র-কাউন্সিলর না থাকা এবং ঘন ঘন প্রশাসক বদলের ফলে কর্মীদের মাঠে কাজ করতে দেখেন না বলে অভিযোগ নাগরিকদের।

মশার পেটে হাজার কোটি টাকা : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত গত ১০ অর্থবছরে ডিএনসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আর ডিএসসিসি ব্যয় করেছে ৩২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে ডিএনসিসির ১৮৭ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে ৮০ কোটি টাকা শুধু কীটনাশক কেনায় ব্যয় হচ্ছে। আরও ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। এই অর্থবছরে ডিএসসিসি মশক নিধনে বরাদ্দ রেখেছে ৫৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৫ কোটি টাকা কীটনাশক কেনায় ব্যয় হবে। এই হাজার কোটি টাকার কর্মযজ্ঞেও ডেঙ্গু পরিস্থিতির লাগাম টানতে পারছে না দুই সিটি করপোরেশন।

নাগরিকদের অভিযোগ, এই কোটি কোটি টাকার কোনো সুফল তারা পাচ্ছেন না। টাকা খরচ হলেও রাজধানীর খাল, ড্রেন ও নালা-নর্দমা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। তা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি নির্মাণাধীন ভবনেও মশা জন্ম নিচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে সুফল মিলছে না। মশক নিধনে যে ওষুধ দেওয়া হতো একের পর এক প্রশাসক বদলের ফাঁকে তাও বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ওয়ার্ডে নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি দায়িত্বে না থাকায় নাগরিকদের অভিযোগ বা জবাবদিহিতার জায়গা সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন নাগরিকরা। রামপুরা হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাকিল পারভেজ বলেন, কালেভদ্রেও মশককর্মী চোখে পড়ে না। আগে তো কিছু হলে কাউন্সিলরকে বলতে পারতাম, অভিযোগ জানাতে পারতাম। কিন্তু এখন বলব কাকে? সরকারি কর্মকর্তাদের তো ভাবই আলাদা।

তবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা কীটনাশক ছিটানো হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে চালানো হয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান। তা ছাড়া জনসচেতনতার জন্য র‌্যালি, সভা-সেমিনার ও মাইকিং করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেই গত ১০ বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে সংস্থা দুটি। তা ছাড়া অতীতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে এ খাতে সফলতা আসেনি। বাজেট সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছেন দুই প্রশাসক। এরই মধ্যে মশক নিধনের নানা কর্মসূচি শুরু করেছেন।

ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, ডিএসসিসির নিজস্ব জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে রবিবার থেকে এক সপ্তাহের বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুই মাস আগেই ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে নাগরিকদের ভূমিকাই সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ডিএনসিসির চারটি সোসাইটির সমন্বয়ের মাধ্যমে নগরবাসীর সহযোগিতায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। এর আগে সোসাইটির সহযোগিতায় আমরা কোরবানির বর্জ্য অপসারণসহ নানা কাজে সফলতা পেয়েছি। বৃষ্টির পানি, বাসা-বাড়িতে জমে থাকা পানিসহ যেকোনো স্থানে জমে থাকা পানি নিজ নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে আমরা বাসা-বাড়িতে ক্যাম্পেইন করব। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে এবং প্রতি নিয়ত তিন মাসের কর্মসূচির আওতায় কার্যক্রম চলমান থাকবে।

জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে হতে পারে সমাধান : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, বেজমেন্টে ও পার্কিংয়ে জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশা জন্মায়। ঢাকা শহরের বাসাবাড়ির নিচতলা ও খোলা জায়গায় জমে থাকা পানিতে ‘কিউলেক্স ফ্যাটিগ্যান্স’ ও ‘কিউলেক্স ট্রাইটেনিওরিঙ্কাস’ মশার বংশ বৃদ্ধি ঘটছে। ঢাকার মোট মশার ৯৯ শতাংশই এই দুটি প্রজাতি, যা সরাসরি জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান করতে পারলেই রাজধানীর ৯৯ শতাংশ মশা এক ধাক্কায় কমে যাবে। বাকি এক শতাংশ মশা বিভিন্ন পাত্রে বা কনটেইনারে জন্ম নেয়, যার অর্ধেক (০.৫ শতাংশ) হলো এডিস মশা, যা আমাদের ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে।

কবিরুল বাশার আরও বলেন, কীটনাশক কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শহরকে যদি মশার জন্য স্বর্গ বানিয়ে রাখি, তবে তারা বংশবিস্তার করবেই। এই স্বর্গকে মশার জন্য নরক বানাতে হলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা জরুরি। মশা নিয়ন্ত্রণে তিনি সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চালুর পরামর্শ দেন। জৈবিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে ড্রেনগুলোতে গাপ্পি মাছ ছাড়া ও পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যাকটেরিয়ার প্রয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।