বাজেট চিন্তাশীল হলেও বাস্তবায়নের ভিত্তি দুর্বল

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নীতিকাঠামো চিন্তাশীল। তবে এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল। এ মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে গতকাল সোমবার ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : অসুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় সংস্থাটির রাশেদা কে চৌধুরী, তৌফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেট ঘিরে যে নীতিকাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে, তাকে মোটামুটিভাবে একটি চিন্তাশীল নীতিকাঠামো বলা যায়। তবে সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। কারণ এ কাঠামোটি অত্যন্ত দুর্বল এমনকি সম্ভবত অকার্যকর একটি আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ছলচাতুরী করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আগের সরকারও তথ্য নিয়ে ছলচাতুরী করেছিল কীভাবে প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো যায়, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো যায় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব থেকে দৃষ্টি সরানো যায়। বর্তমান সরকারও যদি একই পথে এগোয়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।’

বাজেট বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, বাজেট ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জনগণের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ ও নজরদারি প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের অধিকাংশ প্রাক্কলন ৩০ জুন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়নি। আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সব প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তিনি। তা না হলে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং বাজারকে সঠিক সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বল একটা অবস্থা হবে। সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস অন্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি দেওয়ার বিধান পুনরায় কার্যকর করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্থমন্ত্রী প্রথম অর্থনৈতিক বিবৃতি উপস্থাপন করবেন।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেটের হিসাব মেলাতে কৃত্রিমভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যার পুরো চাপ গিয়ে পড়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। এবারও সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত না করে এনবিআরের ওপর অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কিংবা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ কমানো সম্ভব নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত সরকারকে ভর্তুকি কমানোর পথেই যেতে হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। যাদের মূল্য পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে, তাদের ভর্তুকি দেওয়া উচিত নয়। বরং দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে।

প্রবন্ধে সরকারের তিন বছর মেয়াদি ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ কর্মপরিকল্পনারও সমালোচনা করেন দেবপ্রিয়। দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, মানুষ এখন মূল্যস্ফীতি, মজুরি সংকট এবং সঞ্চয় হারানোর ত্রিমুখী চাপে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটা সংকটকাল সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণের শর্ত বা কর্মসম্পাদন সূচক যেন দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে এ খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৭৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে শিক্ষা খাতকে পৃথকভাবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং অন্য কোনো খাতের সঙ্গে একীভূত করা হয়নি, যা ইতিবাচক দিক।’

তিনি বলেন, বাজেটে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। আয়কর কাঠামোর বিভিন্ন স্তর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

সরকারি প্রসাশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আমলাতন্ত্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে দক্ষ নেতৃত্ব ও সুশাসন প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে কাক্সিক্ষত ফল পেতে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’