এবার ৩৫ লাখে চোখ

কনটেইনার পরিবহনে ৩২ লাখের বৃত্ত ভাঙছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। চলতি অর্থবছরের জুন শেষে তা ৩৫ লাখে গিয়ে ঠেকতে পারে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সংখ্যা সর্বপ্রথম ৩০ লাখে উন্নীত হয়েছিল। এরপর গত অর্থবছর (২০২৪-২৫) পর্যন্ত এই সংখ্যা ৩০ থেকে ৩২ লাখের মধ্যে ওঠানামা করছিল। এবারই প্রথম তা ৩৫ লাখে উন্নীত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এই বন্দর দিয়েই বছরে গড়ে ১৩ কোটি টন বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে।

কী এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যার কারণে গত ছয় বছরে যেখানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং তেমন বাড়েনি কিন্তু এবার বাড়তে যাচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা কোনো মিরাকল ঘটনা নয়। আমরা গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছি। আর এসব পরিবর্তনের ফল এখন দেখতে পাচ্ছি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ১২ দিন বন্ধ ছিল। প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলে ১২ দিনে আরও ১ লাখ ২০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হতো। আর তখন জুন শেষে তা ৩৬ লাখ পার হতো।

তিনি বলেন, ‘বন্দরে আমরা জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূন্যে নামিয়ে এনেছি। এখন জাহাজ এলেই জেটিতে বার্থিং করতে পারে। ইয়ার্ডের মধ্যে আমদানি, রপ্তানি ও ওয়েটিং কনটেইনারগুলো কোথায় রাখা হবে সেগুলো একটা ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যাপক আকারে অটোমেশনের ব্যবহার, ই-পেমেন্ট সিস্টেম, বন্দরের ইয়ার্ডে প্রবেশের ক্ষেত্রে গাড়িগুলোর জন্য ই-গেট পাস চালুসহ বিবিধ কারণে এখন কাজে অনেক গতি এসেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সংখ্যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২৯ লাখ ১৯ হাজার ২৩ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ৩০ লাখ ৪ হাজার ১৪২- এ উন্নীত হয়। পরের বছরগুলো ৩০ থেকে ৩২ লাখের মধ্যে ওঠানামা করে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পর এ বছরের ১৩ জুন পর্যন্ত ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯১ একক কনটেইনার হয়ে গেছে। জুন মাসের আরও ১৪ দিন বাকি রয়েছে। দিনে গড়ে ১০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও ১৪ দিনে আরও ১ লাখ ৭০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। সে হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা ৩৫ লাখ অতিক্রম করার কথা। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন করে ২১টি অফডক। এ বিষয়ে কথা হয় অফডকগুলোর সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগের তুলনায় আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার বেড়েছে। আর তা বেড়েছে বলেই নতুন নতুন অফডক হচ্ছে এবং বন্দরের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে অফডকগুলোর অবদানও রয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি আমদানি-রপ্তানি পণ্যগুলোর সিংহভাগই গার্মেন্টস শিল্পের। এ বিষয়ে গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর দিয়ে যেহেতু বেশি কনটেইনার আনা-নেওয়া হচ্ছে তাই বন্দর চাইলে তো ট্যারিফ কমিয়ে নিতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের তো বেশি লাভ করার দরকার নেই। আমরা বন্দরের ট্যারিফ, বিকডার ট্যারিফসহ নানা ধরনের বাড়তি চার্জ দিতে দিতে ক্লান্ত।’

অপরদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে এখন ছোট জাহাজের পরিবর্তে বড় জাহাজ আগমনের সংখ্যা বাড়ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আগে আমরা ৫০০ থেকে ৬০০ কনটেইনারবাহী জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসতাম। এখন ২০০০ কনটেইনারের বড় জাহাজ নিয়ে আসি। এতে পণ্যের ভাড়াও কমছে। এ ছাড়া জাহাজ দ্রুত এসে দ্রুত চলে যেতে পারলে হ্যান্ডলিংও বেশি হয়।’

কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম। ২০২৪ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বখ্যাত শিপিং ম্যাগাজিন লয়েড’স এই তালিকা করে। এর আগে ২০২৩ সালের কনটেইনার হ্যান্ডলিয়ের ওপর অবস্থান ছিল ৬৭তম, ২০২২ সালেও ৬৭তম, ২০২১ সালে ৬৪তম, ২০২০ সালে ৬৭তম ও ২০১৯ সালে ৫৮তম। ২০২৫ সালে যেহেতু বিশ্বজুড়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং সর্বশেষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে শিপিং ব্যবসায় মন্দাভাব ছিল। এই মন্দার মধ্যেও যেহেতু কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে তাই এবার র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি করতে পারে বলে বন্দরসংশ্লিষ্টদের ধারণা।