লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ‘ধর্ষণ ও হত্যা’ করে বস্তাবন্দি লাশ পুঁতে ফেলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে গ্রামবাসী। তাৎক্ষণিক বিচারের জন্য অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশকে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় বিক্ষুব্ধদের হামলায় অবরুদ্ধ পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনায় লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) ও আদিতমারী থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধরা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) গাড়িসহ প্রশাসনের অন্তত সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
ঘটনাটি ঘটেছে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার বিকেল থেকে শিশু নন্দিনী কান্ত রায় (৭) নিখোঁজ ছিল। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও তার সন্ধান পাননি। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেতে সদ্য খুঁড়ে রাখা নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে ওই মাটি খুঁড়ে নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় ওই গ্রামের রণজিৎ কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্র রায়কে (২২) ওই ভুট্টা ক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। এই খবর প্রচার হলে এলাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই সন্দেহের জেরে এলাকাবাসী বিধান চন্দ্র রায়কে ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করে মঙ্গলবার দুপুরে তার বাড়িতে চড়াও হয়। বিধান নিজের ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন। বিক্ষুব্ধ মানুষজন ঘরের তালা ভেঙে বিধানকে আটক করে।
খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধান ও তার পিতা রণজিৎ কুমারকে তাদের হেফাজতে নেয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তকে তাৎক্ষণিক বিচারের জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। বিক্ষুব্ধরা পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখে।
খবর পেয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ও পরে জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ পুরো টিমকেও অবরুদ্ধ করে ফেলে।
এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর পুলিশ অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় তাদের লক্ষ্য করে চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ইটের আঘাতে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ প্রশাসনের অন্তত ২০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ সরকারি ৭টি যানবাহন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিধান চন্দ্র মাদকাসক্ত। সে প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ফুসলিয়ে ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এরপর লাশ বস্তায় ভরে মাটিতে পুঁতে রাখে।
পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, ফলিমারী গ্রামের ঘটনায় আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে। নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মূল অভিযুক্তসহ দুজনকে আটক করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, ‘নৃশংস এই শিশু হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’