ঢাবির আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ

ফ্যাসিবাদ সংশ্লিষ্টদেরও নিয়োগের সুপারিশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে নানা অসঙ্গতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনার্স ও মাস্টার্সের ফলাফল, ব্যাচে অবস্থান, গবেষণা প্রকাশনা এবং অ্যাকাডেমিক যোগ্যতার মতো মানদ-ের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের কথা থাকলেও বাস্তবে এসব মানদন্ড উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিবেচনায় কয়েকজন প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, শিক্ষক নিয়োগের জন্য মোট ২৪ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে ১৬ জনকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। সেখান থেকে ছয়জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু সাক্ষাৎকারে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর বরাদ্দ নেই, তাই প্রার্থীদের অনার্স ও মাস্টার্সের ফলাফল, ব্যাচে অবস্থান, গবেষণা প্রকাশনা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য অ্যাকাডেমিক যোগ্যতার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত নির্বাচন হওয়ার কথা।

তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব মানদন্ডের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে কয়েকজন প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে যেমন কয়েকজন প্রার্থী সুবিধা পেয়েছেন, তেমনি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা প্রার্থীও সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ ছাড়া একজন প্রভাবশালী বিএনপিপন্থি শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ফলাফলে পিছিয়ে থাকা কয়েকজন প্রার্থীও নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন।

প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থীদের অনার্স ও মাস্টার্সের সমন্বিত ফলাফলের ভিত্তিতে শীর্ষ অবস্থানে ছিলেন তাসনিম নাজিয়া, তাসনিম নুসরাত রেজা, আবুজার গিফারী, মাকসুদা সরকার, আব্দুর রহমান মজুমদার, সাদমান রিজওয়ান অপূর্ব, সুরাইয়া ফেরদৌস এবং ঐশী রহমান।

তবে অভিযোগ রয়েছে, এই শীর্ষস্থানীয়দের মধ্য থেকে মাত্র তিনজনকে সুপারিশ করা হয়েছে। আব্দুর রহমান মজুমদার, তাসনিম নাজিয়া এবং আবুজার গিফারী তিনজনই নিজ নিজ ব্যাচে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। কিন্তু আব্দুর রহমান মজুমদারের নাম সুপারিশ তালিকায় এলেও তাসনিম নাজিয়া ও আবুজার গিফারীর নাম সেখানে নেই।

আইন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, যাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে তারা হলেনÑ মনিরুজ্জামান, মাকসুদা সরকার, আব্দুর রহমান মজুমদার, আলী মাশরাফ, তাসনিম নুসরাত রেজা এবং আসাদুল্লাহিল গালিব। অভিযোগ অনুযায়ী, এদের মধ্যে মনিরুজ্জামান, আলী মাশরাফ ও আসাদুল্লাহিল গালিবের একাডেমিক ফলাফল অন্যান্য অনেক প্রার্থীর তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও তারা সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কিছু ছবিতে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এদিকে, মনিরুজ্জামান ও তার স্ত্রী মাকসুদা সরকার দুটি যৌথ গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দুটি জার্নালে এসব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো ‘প্রিডেটরি জার্নাল’র বৈশিষ্ট্য বহন করে। মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রিভিউ সম্পন্ন করে এসব জার্নাল গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে থাকে। অনুসন্ধানে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আরও জানা গেছে, এই গবেষণা প্রবন্ধের ভিত্তিতেই তারা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) পদোন্নতি পেয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সাদ্দাম আমার ক্লাসমেট ছিল, সে হিসেবে তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। ছবি থাকাও স্বাভাবিক। আপনারা খেয়াল করবেন, আওয়ামী আমলে যখন পরীক্ষা দিয়েছিলাম তখন আমাকে বিএনপি করি বলে বাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমি ব্যাচে ফার্স্ট ছিলাম।’ গবেষণা প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আমাদের অ্যাপ্রোচ করা হয়েছিল। পরে আমাদের জার্নাল প্রকাশ হয়। একসময় আমি মেইল করে জার্নাল ডিলিট করতে বললেও তা করা হয়নি। আমরা এটা প্রচারও করি না। ক্যাম্রিজ থেকে আমার সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট থিসিসে। এ ছাড়া আমার অনেক লেখা কিউ২, কিউ৩ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।’

একইভাবে আলী মাশরাফ অনার্সে চতুর্থ এবং মাস্টার্সে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার ছবি পাওয়া গেছে এবং অনুসন্ধানে এ অভিযোগের সমর্থনে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আইন বিভাগের বয়কট হওয়া আওয়ামীপন্থি শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আসাদুল্লাহিল গালিবের অনার্স ও মাস্টার্সের সমন্বিত ফল ৭.৫৭। তিনি ফলাফলের ভিত্তিতে প্রথম ছয়জনের মধ্যে পড়েন না। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপিপন্থি দুই শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এদিকে তাসনিম নুসরাত রেজা অনার্সে তৃতীয় এবং মাস্টার্সে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও একই ব্যাচের মাস্টার্সে প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তাকে সুপারিশ করা হয়েছে। তার বিষয়ে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী সুপারিশ করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট সিলেকশন বোর্ডে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, আইন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান, বর্তমান ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ ইকরামুল হক, বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন। এ বিষয়ে আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ ইকরামুল হক বলেন,  ‘এখনো নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত হবে। আপাতত সুপারিশ করা হয়েছে তাদেরকে। এ বিষয়ে সিলেকশন বোর্ডের সভাপতি প্রো-ভিসি (শিক্ষা) মহোদয়কে বলতে পারেন।’

এ বিষয়ে আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও আইন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খানকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘এটা এখনো গোপনীয় বিষয়। সিন্ডিকেটের আগে কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এটা নিয়ে আমাদের বলাও উচিত না। সিন্ডিকেট হোক, এরপর বলা যাবে।’