মেসি-রোনালদোর শেষের শুরু

লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দ্বৈরথের দুই মহানায়ক একই দিনে পা রাখছেন তাদের ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। বাংলাদেশ সময় আজ সকালে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করছেন মেসি। আর রাতের ভাগে কঙ্গোর মুখোমুখি হয়ে পর্তুগালের জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে নামছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর একই দিনে বিশ্বমঞ্চে এই যাত্রা শুরু ফুটবলপ্রেমীদের মনে যেমন এক অনন্য উন্মাদনা তৈরি করেছে, তেমনি জাগিয়ে তুলেছে এক মন কেমন করা সুর। কারণ, এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সেরা দুই ফুটবলারের সম্ভাবত শেষ বিশ্বকাপ। আগামী ২৪ জুন মেসি পা দেবেন ৩৯ বছরে। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচ (অস্ট্রিয়া) এবং তৃতীয় ম্যাচের (জর্ডান) মাঝামাঝি সময়ে পড়বে তার জন্মদিন। আপাতত আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তার আরও একটি বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে, যা হতে যাচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা জার্সিতে তার ঐতিহাসিক ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

কাতার বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টানাকে অধরা সোনালি ট্রফি এনে দিয়ে লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৃত্তটি পূরণ করেছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন ওখানেই হয়তো শেষ। কিন্তু ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে আরও কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে তিনি এসেছেন এই বিশ্বকাপে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যখন মেসি মাঠে নামবেন, তখন তার ওপর কাতার বিশ্বকাপের মতো কোনো ট্রফি জয়ের তীব্র মানসিক চাপ থাকবে না। বরং এবার তার লক্ষ্য থাকবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা এবং প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করে ফুটবলকে বিদায় বলা।

এই টুর্নামেন্টে নিজের অংশগ্রহণ নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এক রোমাঞ্চকর রহস্য জিইয়ে রেখেছিলেন তিনি। তিন মাস আগেও কোচ লিওনেল স্কালোনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। এই পুরোটা সময় মেসির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি কথা এবং বিশেষ করে তার নীরবতার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, হয়তো ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাই হতে পারে বিদায়ের উপযুক্ত সময়, যেমনটা আনহেল ডি মারিয়া করেছিলেন। কিন্তু মেসি নিজে কখনোই চূড়ান্ত কিছু জানাননি।

‘আমি ওকে সাধারণ একটি মেসেজ পাঠিয়েছিলাম’ কয়েক দিন আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রকাশ করেন, ‘এবং ও আমাকে বলেছিল, ও স্কোয়াডের তালিকায় নাম থাকার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘তুমি দলে আছো।’ ও অন্য সাধারণ খেলোয়াড়দের মতোই কোচের দল ঘোষণার অপেক্ষা করেছে। এটা আমাকে স্বস্তি দিয়েছে।’ মেসি পরে ব্যাখ্যা করেন ‘সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। আমি দিন দিন ভালো অনুভব করছিলাম। খেলার সুযোগ পেয়েছি, ছন্দ ফিরে পেয়েছি এবং মাঠে সময় কাটাতে পেরেছি।’

অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যা বানিয়ে ৪১ বছর বয়সেও গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন সিআরসেভেন। ইউরো, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর সব জিতেছেন, কিন্তু পর্তুগালের হয়ে একটি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টটি রোনালদোর জন্য তার ক্যারিয়ারের ডায়েরিতে শেষ সোনালি পাতা যোগ করার চূড়ান্ত সুযোগ। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিকের জন্য এই বিশ্বকাপটি তার অদম্য ইচ্ছা এবং ট্রফি জেতার তীব্র ক্ষুধার এক শেষ অগ্নিপরীক্ষা।

তবে বিশ্বকাপ ট্রফি ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে রোনালদোর ভাবনাটা একদমই ভিন্ন। তিনি একবার বলেছিলেন ‘লোকে বলে বিশ্বকাপ জিতলেই ক্রিশ্চিয়ানো সর্বকালের সেরা হবে! আমি এই কথার সঙ্গে একমত নই। ইতিহাস সেরা নির্ধারণ করার জন্য মাত্র ছয় বা সাতটি ম্যাচের একটি টুর্নামেন্ট কি যথেষ্ট? আপনি কি মনে করেন এটা ন্যায্য? এটা মোটেও ন্যায্য বিষয় নয়।’ বিশ্বকাপ জেতাটা যে এখন আর তার পরম আরাধনা বা অন্ধ স্বপ্ন নয়, সেটিও পরিষ্কার করেছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা, ‘আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন বিশ্বকাপ জেতা কি আমার স্বপ্ন? আমি বলব, না, এটা আমার স্বপ্ন নয়। সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ জিতলেই ফুটবলের ইতিহাসে আমার নাম বদলে যাবে না।’

রোনালদোর কাছে ছয়-সাত ম্যাচের টুর্নামেন্ট শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি না হলেও, এই বয়সে এসেও দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর পরিসংখ্যানের চুলচেরা বিশ্লেষণ থামছে না। মেক্সিকান গোলরক্ষক মেমো ওচোয়া এই আসরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অনন্য রেকর্ড গড়ার দৌড়ে তৃতীয় ব্যক্তি হলেও তিনি প্রথম ম্যাচে খেলেননি, তাই আর্জেন্টাইন অধিনায়কই প্রথমে এই উচ্চতায় পৌঁছাবেন। তবে এর চেয়েও বড় আকর্ষণ হলো জার্মানির মিরোস্ল্যাভ ক্লোসার করা বিশ্বকাপে ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ বা অতিক্রম করা। বর্তমানে মেসির গোলসংখ্যা ১৩।

মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ এক সময়ের সতীর্থ, ৮ বছর ধরে তার কোচ লিওনেল স্কালোনি, ‘শুধু আর্জেন্টাইনরাই নয়, আমার মনে হয় পুরো বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরাই ওকে মাঠে দেখতে চায়, ওর খেলা উপভোগ করতে চায়। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক কন্ডিশনে ও খেলেছে, কিন্তু আমাদের দলে ওর প্রভাব কখনোই কমেনি। মেসি সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল এবং সে আমাদের জন্য অপরিহার্য। এখন এই গুরুত্ব আরও অনেক বেশি।’

লিওনেল মেসির মতো নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ৩৮ বছর বয়সী ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি মেতেছেন দীর্ঘদিনের সতীর্থের প্রশংসায়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি রোমন্থন করে ওতামেন্দি মেসিকে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

‘আমরা একসঙ্গে অনেক সুন্দর মুহূর্ত পার করেছি। এত বড় তারকা হওয়ার পরও ও অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ, যে ক্যাম্পের প্রতিটি অনুশীলন দারুণভাবে উপভোগ করে এবং নিজেকে প্রস্তুত করে। মাঠের ভেতরে ও এক ‘প্রতিযোগিতাপ্রিয় দানব’। ওর এই জেদ বাকিদেরও তাড়িত করে, যাতে কেউ গা ভাসিয়ে না দেয়। আমাদের দায়িত্ব ওর পাশে থাকা, ওকে সমর্থন করা এবং মাঠে সাহায্য করা।’

৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকান লিগে খেলছেন মেসি। কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে স্কালোনি তাকে খুব সাবধানে খেলিয়েছেন এবং দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে বিরত রেখেছেন। এবার অবশ্য বাঁ পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের সামান্য চোট নিয়েই তিনি ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন, যার কারণে ধীরে ধীরে তাকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

এক মাস আগে, তার ছায়াসঙ্গী রদ্রিগো ডি পল জানিয়েছিলেন, ক্লাবের অনুশীলনের বাইরেও তারা দুজনে আলাদা একটি বিশেষ রুটিন মেনে চলছেন। ‘শারীরিকভাবে সেরা ফর্মে থাকার জন্য আমরা দুজনেই কঠোর পরিশ্রম করছি। আমরা নিজেদের উদ্যোগে ডাবল শিফটে অনুশীলন করছি।’ ডি পল এই অনুশীলন সেশনগুলো ভিডিও করে রাখছেন, যাতে আলবিসেলেস্তেরা যদি তাদের চতুর্থ স্টার (বিশ্বকাপ) জয় করতে পারে, তবে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা যায়।

বিগত দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন এই দুই কিংবদন্তি। কে সেরা এই বিতর্কে বিভক্ত থেকেছে পুরো পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত। তবে এবারের বিশ্বকাপ কোনো বিতর্কের নয়, বরং এই দুই নক্ষত্রকে শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখার আনন্দ উপভোগ করার।