দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্ধেকের বেশি জ্বালানি আমদানি করা হয়। বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি আমদানি প্রায়ই বিঘ্নিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কাটিয়ে ওঠার অন্যতম পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার। জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য ও ঘাটতির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিকল্প হলো সৌরবিদ্যুৎ। এটি লোডশেডিংয়ের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে এবং পরিবেশবান্ধবও। এ জন্য সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ জমির সংস্থান করা দুরূহ। এক্ষেত্রে চা বাগানের হাজার হাজার একর অব্যবহৃত জমি এর বিকল্প হতে পারে। কিন্তু চা বাগানের এই জমিতে চোখ নেই সরকারের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা বাগানের অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনামূল্যে দিলে অন্তত ২০ শতাংশ উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। এর সঙ্গে সরকারি খরচে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিড পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণ করে দেওয়া হলে এই খরচ আরও ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব। দেশে জমি ও গ্রিড লাইনসহ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ ৭ সেন্ট পড়বে। আর সরকার জমি ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করে দিলে তা ৫ দশমিক ২০ সেন্টে নামিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২৫ টাকা বিনিময় হার নির্ধারণ করলে তা ৬ দশমিক ২৫ টাকার সমান। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বর্তমানে দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ গড়ে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। এই প্রক্রিয়ায় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের সাশ্রয় হবে ৬ টাকা ৬৬ পয়সা।
সৌরবিদ্যুতে ভারত মডেল : ভারতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জমি দেওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোও নির্মাণ করে দেয় সরকার। যদিও বাংলাদেশে গড়ে দিনে সাড়ে চার ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ভারতে এই হার রাজ্যভেদে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট আড়াই রুপিতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা সাড়ে তিন টাকার মতো।
বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় নামছে ৭ সেন্টে : রাষ্ট্রীয় নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি সম্প্রতি পদ্মা সোলার প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করেছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের সর্বোচ্চ ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৭ সেন্ট হতে পারে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পদ্মা সেতুর অব্যবহৃত জমি লিজ নিয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এখানেও জমিটি বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোতে সরকার বিনিয়োগ করে দামের একটি মানদ- নির্ধারণ করতে পারত। কেন্দ্রটির সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণে কোম্পানিটির ১৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ব্যয়ের প্রকল্প।
চা বাগানের জমি বিকল্প কেন : বাংলাদেশ চা বোর্ডের হিসাবে দেশে ১৭০টি চা বাগান রয়েছে। দেশের সমতল এলাকায় ক্ষুদ্র আয়তনের কিছু নিজস্ব চা বাগান থাকলেও সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ বড় চা বাগান সরকারের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে গড়ে উঠেছে। দেশে মোট চা বাগানের জমির পরিমাণ ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৫৩ একর জমিতে চা চাষ হয়। চা বোর্ড বলছে, ভবিষ্যতে আরও ১৬ হাজার ১৩০ একর জমিতে চা বাগান করা যেতে পারে। বর্তমানে বাগানের এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৮ একর জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে। যদিও এর একটি অংশ রাস্তা, কারখানা এবং চা শ্রমিকদের আবাসনের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এর পরিমাণ খুব সামান্য। এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আড়াই একর জমির প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে চা বাগানের অব্যবহৃত এই হাজার হাজার একর জমি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় এসি ল্যান্ডের মাধ্যমে চা বাগানের অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। এতে কোথায় কত জমি পড়ে আছে তা জানা যাবে। প্রত্যেকটি চা বাগানের কাছেই অব্যবহৃত জমির একটি তালিকা রয়েছে। এদিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অব্যবহৃত জমির তালিকা চেয়েছে সরকার। তবে চা বোর্ডের কাছে এমন তালিকা চাওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন জানান, তারা এ ধরনের কোনো চিঠি পাননি।
অব্যবহৃত জমি ফেরত নিতে পারবে সরকার : সরকারের কাছ থেকে ৯৯ বছর বা স্থায়ী বন্দোবস্তে জমি নেওয়ার যে আইন রয়েছে, সেখানে বলা আছে যে উদ্দেশ্যে জমি ইজারা নেওয়া হবে, কেবল সেই কাজেই ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য বেশি লাভজনক হলেও চা বাগানের জমিতে ফল চাষ করা যায় না। আর সরকার যখন ইচ্ছা এই ইজারা বাতিল করতে পারে।
জানতে চাইলে চা বোর্ডের সচিব মো. মমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চা বাগানের জন্য যেসব কোম্পানি জমি ইজারা নিয়েছে, তারা চাইলেই সেখানে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে না। এ জন্য সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে। চা চাষের জমিতে অন্য কিছু করার বিধান নেই। চা বাগানের মধ্যে অনেক অব্যবহৃত জমি রয়েছে।।
সঙ্গত কারণে চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য এসব জমি ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। জমি ফেরত নিয়ে সরকারি উদ্যোগে দরপত্র আহ্বান করে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাগান মালিকদের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দৌড়ঝঁাঁপ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফিনলের একটি চা বাগান রয়েছে। এই চা বাগানে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাগানের মালিকপক্ষ। এ জন্য তারা একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও সই করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি চাওয়া হয়। তিনি ফিনলেকে আবেদন করার নির্দেশ দেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদের চেয়ারম্যান কামরান তানভীর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দক্ষিণমুখী (সাউথ-ফেসিং) যেসব টিলা রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত সূর্যালোকের কারণে চা চাষ করা যায় না। এ ছাড়াও চা বাগানে অনেক অব্যবহৃত জমি রয়েছে। সেখানে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) জরিপ করে জানিয়েছে, শুধু সিলেট অঞ্চলের অব্যবহৃত চা বাগানের জমিতেই ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব।
ইডকলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের কারিগরি প্রধান ওয়াহিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চট্টগ্রাম ও সিলেটে ১৬টি চা বাগান পরিদর্শন করে দেখেছি সেখানে আগামী ৫০ বছর চা চাষ হবে না এমন জমিতে ৪০০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এই জমি সৌরবিদ্যুতের জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। আমাদের অনেক চা বাগান আছে। সেখানে এমন জমি থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, লিজ নিয়ে যে জমি চা বাগান মালিকরা ব্যবহার করে না, চুক্তি অনুযায়ী তার দখলও তারা রাখতে পারে না। সরকারের উচিত এসব জমি ফিরিয়ে নিয়ে দরপত্র আহ্বান করা। এসব জমি যেহেতু অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তাই সেগুলো সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিনামূল্যে দিলে কোনো ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। সেক্ষেত্রে কোনো চা বাগানের মালিক যদি কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে তাহলে তাকে দিলে তো সমস্যা নাই।