জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে খরা, ভূমি অবক্ষয় ও পানিসংকটের ঝুঁকি। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে, দীর্ঘ হচ্ছে খরার সময়কাল এবং বাড়ছে তাপপ্রবাহের প্রকোপ। পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চল গঠনের পর উত্তরাঞ্চলে খরা কমেছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। যেটি ভবিষ্যতের জন্য অশানি সংকেত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের কিছু এলাকা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আজ বুধবার বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে প্রতি বছর ১৭ জুন এ দিনটি পালন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বিশেষ বার্তায় বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ রেঞ্জল্যান্ড (চারণভূমি) অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে বা অবক্ষয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, জীববৈচিত্র্য হ্রাস করছে এবং গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ বৃদ্ধি করছে। এই বিশ্ব দিবসে আমরা বিশ্বের রেঞ্জল্যান্ডগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার এবং সেগুলোর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য জরুরি আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, এ বছর একই সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক রেঞ্জল্যান্ড ও পশুপালনকারী জনগোষ্ঠী বর্ষ’ও পালিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে আমাদের ভূমিকে রক্ষা করতেই হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মরুকরণ বলতে সাহারা মরুভূমির মতো বালুর বিস্তার বোঝায় না। দীর্ঘস্থায়ী খরা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, পানির সংকট, বন উজাড়, নদী ও জলাভূমির সংকোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পরিবেশগত অবক্ষয় ভবিষ্যৎ মরুকরণের পূর্বাভাস বহন করে।
তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও খরা মোকাবিলা কৌশলকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের সবচেয়ে খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চল। কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে এ অঞ্চলে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে অনেক অগভীর নলকূপে পানি পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ উত্তরাঞ্চলের কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু খরা ও তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সেচ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ধান, গমসহ অন্যান্য প্রধান ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে। খরা পরিস্থিতি আরও তীব্র হলে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবুল কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানি সংকট ও খরার কারণে আশির দশকে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও এলাকার ৯০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ হতো না। যেসব জমিতে চাষাবাদ হতো, সেগুলোর ফসলও মাঝেমধ্যে নষ্ট হয়ে যেত। এই এলাকার মানুষ কাজের সন্ধানে অন্য অঞ্চলে ছুটত। পড়াশোনার ব্যবস্থা তেমন ছিল না। ১৯৮৬ সালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পর ধীরে ধীরে এখানকার প্রায় ৯০ শতাংশ জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। অবশিষ্ট যেই ১০ শতাংশ জমি রয়েছে, সেগুলোও চাষাবাদের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ কার্যক্রম ঠিক রাখতে গভীর নলকূপ বসানোর পাশাপাশি ১৮ কিলোমিটার দূরের নদী থেকে পানি আনা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ করায় গরমের প্রভাব অনেকটা কমে সহনীয় মাত্রায় এসেছে। আগে এখানে বৃষ্টি কম হতো, গাছপালা বেশি থাকায় এখন বৃষ্টির পরিমাণও আগের তুলনায় বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় খরা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিক এসব দুযোর্গ মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’
আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশীদ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বেশি হতো। এখন প্রাক-বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিল মাসেই বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুম, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস এবং খরার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, আবহাওয়ার এ পরিবর্তন শুধু কৃষির জন্য নয়, জীববৈচিত্র্য, বনজ সম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় সমন্বিত পানি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল-বিল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, খরা-সহনশীল ফসলের চাষ, বনসৃজন এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া ভূমি ও পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।