ইসলামের ইতিহাসে যেসব মহান ব্যক্তিত্ব তাদের ইমান, ত্যাগ, উদারতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে হজরত ওসমান (রা.) অন্যতম। তিনি ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা, মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি ও জামাতা। তার জীবন ছিল দানশীলতা, আল্লাহভীতি ও মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোরআন সংকলন, মুসলিম রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ এবং জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ বংশের বনু উমাইয়া গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আফফান ইবনে আবুল আস এবং মাতার নাম আরওয়া বিনতে কুরাইজ। বংশীয় মর্যাদা, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে তিনি মক্কার অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সৎ, মার্জিত ও চরিত্রবান। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি মদপান, মূর্তিপূজা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।
আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে তার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সততা ও দক্ষতার কারণে তার ব্যবসা দ্রুত প্রসার লাভ করে। বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়ার কারণে মানুষ তাকে ‘গনি’ বা ধনী বলে ডাকত। তবে সম্পদের প্রাচুর্য তার চরিত্রে অহংকার সৃষ্টি করেনি। বরং তিনি সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে উদারভাবে সম্পদ ব্যয় করতেন।
ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ কন্যা রুকাইয়াকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। পরে রুকাইয়া (রা.) ইন্তেকাল করলে রাসুল (সা.) তার আরেক কন্যা উম্মে কুলসুমকে ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। নবীর দুই কন্যার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বিরল সম্মান লাভ করায় তিনি ‘জুন-নুরাইন’ বা ‘দুই জ্যোতির অধিকারী’ উপাধিতে ভূষিত হন।
ইসলামের জন্য তার ত্যাগ ও দানশীলতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। মদিনায় মুসলমানদের পানির সংকট দূর করতে তিনি রুমা কূপ ক্রয় করে জনসাধারণের জন্য ওয়াকফ করে দেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। একইভাবে মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের জন্য তিনি নিজ অর্থে জমির ব্যবস্থা করেন।
তাবুক যুদ্ধের সময় মুসলমানদের আর্থিক সংকট দেখা দিলে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি শত শত উট, অসংখ্য ঘোড়া এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করেছিলেন। তার এই অবদানে মুগ্ধ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘আজকের পর ওসমান যাই করুক, তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।’ (জামে তিরমিজি)
হজরত ওমর (রা.)-এর শাহাদাতের পর তিনি মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হন। প্রায় বারো বছর তিনি খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে ইসলামি সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। ফার্স, খোরাসান, আর্মেনিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল ইসলামি শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলিম নৌবাহিনীরও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে এ সময়।
তার শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পবিত্র কোরআনের সংকলন। ইসলামের বিস্তারের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআন তেলাওয়াতের উচ্চারণে পার্থক্য দেখা দিতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি কোরআনের একটি নির্ভুল ও প্রামাণ্য অনুলিপি প্রস্তুত করে। পরে সেটার কপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। এ ঐতিহাসিক উদ্যোগের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ কোরআনের পাঠে বিভক্তির আশঙ্কা থেকে রক্ষা পায়। এ কারণে তাকে ‘জামিউল কোরআন’ বা কোরআন সংকলনকারী বলা হয়।
তার শাসনামলের শেষদিকে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন বিদ্রোহীরা তার বাড়ি অবরোধ করে এবং তিনি কোরআন তেলাওয়াত অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন।
লেখক : ইসলামি গবেষক