প্রতিটি জাতির নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম বাহক হলো বর্ষপঞ্জি। এটি একটি জাতির চেতনা, বিশ্বাস ও সভ্যতার পরিচায়ক। মুসলিম উম্মাহর জন্য হিজরি সন এমনই একটি গৌরবময় বর্ষপঞ্জি, যা ইসলামের ইতিহাস, ত্যাগ, সংগ্রাম ও বিজয়ের স্মারক হিসেবে যুগ যুগ ধরে মুসলিম জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে আসছে। হিজরি সন মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন, সামাজিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই হিজরি সনের সংরক্ষণ ও প্রচলন মুসলিম পরিচয় রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হিজরি সনের সূচনা : হিজরি সনের সূচনা হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের কোনো নির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জি ছিল না। খেলাফতে রাশেদার দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
তখন সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে বিভিন্ন ঘটনার মধ্য থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতকে ইসলামি সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কারণ হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল সত্যের জন্য ত্যাগ, ইমানের জন্য সংগ্রাম এবং একটি নতুন ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা।
হিজরি সনের বৈশিষ্ট্য : হিজরি সন একটি চন্দ্রভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। এতে বারোটি মাস রয়েছে এবং চাঁদের আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে মাস নির্ধারিত হয়। হিজরি মাসগুলো হলো মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল উলা, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি, যা আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।’ (সুরা তওবা ৩৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে চন্দ্র মাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং ইসলামি বিধিবিধানের অনেকগুলোই এই চন্দ্রবর্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ইবাদতের সঙ্গে হিজরি সনের সম্পর্ক : হিজরি সনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মুসলমানদের প্রধান ইবাদতসমূহ এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রমজান মাসে রোজা পালন, শাওয়ালে ঈদুল ফিতর, জিলহজ মাসে হজ ও ঈদুল আজহাÑ সবই হিজরি সনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
রমজান মাসের আগমন কিংবা ঈদের চাঁদ দেখা মুসলমানদের হৃদয়ে এক বিশেষ আবেগ ও আনন্দ সৃষ্টি করে। হিজরি সন তাই মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি মুসলমানরা নিজেদের বর্ষপঞ্জিকে অবহেলা করে, তবে ধীরে ধীরে তারা তাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয় থেকেও দূরে সরে যেতে পারে। তাই হিজরি সনের প্রচলন ও চর্চা মুসলিম পরিচয় রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম জাতিসত্তার প্রতীক : হিজরি সন মুসলিম জাতিসত্তার এক উজ্জ্বল প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাষা, সংস্কৃতি ও বর্ণের ভিন্নতা থাকলেও হিজরি সন মুসলমানদের এক অভিন্ন পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে।
একজন মুসলমান যখন বলে আজ ১ মহররম, ১২ রবিউল আউয়াল বা ১ রমজান, তখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মুসলমানও একই তারিখ ও অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। এই ঐক্যবোধ মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ব ও জাতিসত্তাকে আরও সুদৃঢ় করে।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রেগরিয়ান সনের ব্যাপক ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভুলে যাব। বরং আধুনিক জীবনের প্রয়োজনের পাশাপাশি হিজরি সনের চর্চা ও ব্যবহার বাড়ানো মুসলিম আত্মপরিচয়ের অংশ হওয়া উচিত।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক : হিজরি সন মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিজরি তারিখের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নবীজি (সা.)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তি, হিজরত, বদর, ওহুদ, খন্দকসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিজরি মাস ও তারিখের মাধ্যমেই স্মরণ করা হয়। এ ছাড়া মুসলিম বিশ্বের বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থ, ফতোয়া, দলিল ও সাহিত্যকর্ম হিজরি সনের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে।
যদি হিজরি সনের ব্যবহার কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও হিজরি সনের চর্চা অপরিহার্য।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয় : বর্তমান সময়ে আমাদের উচিত ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে হিজরি সনের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বাড়িতে ক্যালেন্ডার টাঙানোর সময় হিজরি তারিখ সংবলিত ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা যেতে পারে। বিভিন্ন ইসলামি অনুষ্ঠান, সভা-সেমিনার, বইপত্র ও লেখালেখিতে হিজরি তারিখ উল্লেখের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মুসলিম জাতিসত্তার গৌরবময় পরিচয় : হিজরি সন মুসলিম জাতিসত্তার এক অনন্য পরিচয়চিহ্ন। এটি ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ইবাদত ও উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। মহানবী (সা.)-এর হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত এই বর্ষপঞ্জি মুসলমানদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা দেয়।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর