বাবুই পাখির বাসার মত আম গাছে ঝুলছে ফ্রুট ব্যাগিং আম

দূর থেকে দেখলে মনে হবে আম গাছে ঝুলছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। তবে এগুলো কোনো পাখির বাসা নয়, আমকে পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগ। নিরাপদ ও দাগমুক্ত আম উৎপাদনের লক্ষ্যে বাগাতিপাড়া উপজেলায় কয়েক বছর ধরে এ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন আম বাগানের গাছে গাছে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে এসব ব্যাগ, যা যেমন আমের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে দৃষ্টিনন্দন এক দৃশ্য। অপরদিকে কৃষকরাও পাচ্ছেন ভালো মানের মুনাফা আর ভোক্তারা পাচ্ছেন মানসম্মত নিরাপদ আম।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও রপ্তানিযোগ্য আমের বাজার সম্প্রসারণে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে দিন দিন বাগাতিপাড়ার আমচাষিদের মধ্যে এ পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তারাও পাচ্ছেন নিরাপদ ও মানসম্মত আম।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার একাধিক আম বাগানে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়েছে জামনগর ইউনিয়নের প্রায় ৪ হেক্টর জমির আম বাগানে। দূর থেকে তাকালে গাছজুড়ে ঝুলে থাকা ব্যাগগুলো দেখতে অনেকটা বাবুই পাখির অসংখ্য বাসার মতো মনে হয়। তবে এগুলো কোনো পাখির বাসা নয়, বরং পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে আমকে সুরক্ষা দিয়ে নিরাপদ, দাগমুক্ত ও উন্নত মানের ফল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ফ্রুট ব্যাগ।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ২০২০ সাল থেকে নিরাপদ ও দাগমুক্ত আম উৎপাদনের লক্ষ্যে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি চালু করা হয়। বর্তমানে উপজেলার ৭ হেক্টর জমির আম বাগানে এ পদ্ধতিতে আম চাষ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর উপজেলায় মোট ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, উপজেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার আম বিক্রি হচ্ছে। পুরো মৌসুমে আম বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উপজেলার পৌরসভার আরজিমাড়িয়া ঘোরলাজ মহল্লার আমচাষি মুনতাজ আলী বলেন, তার প্রায় ৫০ বিঘা জমিজুড়ে বিভিন্ন জাতের আমের বাগান রয়েছে। বাগানে ফজলি, লখনা, আম্রপালি, হিমসাগর (খিরসাপাত), ল্যাংড়া ও আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আমের চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগিং আরও বেশি করার চিন্তা থাকলেও মোট আম থেকে প্রায় ২০ হাজার আমে ফ্রুট ব্যাগিং করেছেন। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং ফালের গায়ে কোনো দাগ পড়ে না। বিশেষ করে আশ্বিনা ও ফজলি জাতের আম আরও কিছুদিন পরে পরিপক্ব হবে। তাই এ জাতের আমই বেশি ফ্রুট ব্যাগিং করেছেন। আর এসব আম বাজারজাত করতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। এ বছর তিনি প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার শুধু ফ্রুট ব্যাগিং করা আম বিক্রি করবেন বলে আশা করেন।

উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া এলাকার আমচাষি গুলজার মেম্বার জানান, তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ বিঘা জমিতে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করছেন। তাঁর বাগানে ফজলি, হিমসাগর (খিরসাপাত) ও আশ্বিনা জাতের প্রায় লক্ষাধিক আমে ফ্রুট ব্যাগিং করেছেন। তিনি বলেন, এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমে ফলমাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেকাংশে কমে যায়। এতে কীটনাশকের ব্যবহারও কম প্রয়োজন হয়। ফলে নিরাপদ, দাগমুক্ত ও মানসম্মত আম উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া বাজারে ফ্রুট ব্যাগিং করা আমের চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের গালিমপুর এলাকার আমের আড়তদার সাদ্দাম হোসেন বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং আম এখন খুবই অল্প পরিমাণে বাজারে আসছে। সাধারণত ফজলি ও আশ্বিনা বা যে সকল আম একটু দেরিতে পরিপক্ব হয়, সেই আমই আমাদের এলাকাতে বেশি ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়। অন্যান্য আম যখন শেষের দিকে চলে আসে, সেই সময় এ আমগুলো বাজারে আসে। তখন দাম অনেক বেশি থাকে। আর এমনিতেও ফ্রুট ব্যাগিং আম অন্যান্য আমের চেয়ে সব সময় দাম বেশি থাকে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ভবসিন্ধু রায় বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমিয়ে নিরাপদ, দাগমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য মানের আম উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষকদের মধ্যে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষক এ প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি।