প্রধানমন্ত্রী

প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা, কৃষিখাত হবে সমৃদ্ধির মূল চালিকা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাত হবে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তি নির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বুধবার (১৭ জুন) বিকালে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বের লিখিত উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে সরকার 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' কর্মসূচির আওতায় বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কৃষকদের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিত করতে 'কৃষক কার্ড' বিতরণ।

তিনি জানান, ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের ১১টি উপজেলায় এটি পাইলটিং হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ২০ হাজার ৮৩২টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও স্বল্পমূল্যে সেচ সুবিধা পাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শস্য, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। এজন্য ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন দেশের প্রায় ১৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক।

তিনি আরও জানান, সেচ সুবিধা নিশ্চিত ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ চলছে। এছাড়া ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি সার সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কৃষিখাতে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটাতে সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি) এবং ড্রোনের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্মার্ট কৃষি ও প্রিসিশন এগ্রিকালচারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী 'কৃষকবাজার' স্থাপন করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়ালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। গত ১৩ মে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদিত হয়েছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, দক্ষিণবঙ্গে লবণাক্ততা কমবে এবং সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম রক্ষা পাবে। এছাড়া এখান থেকে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা দেশের জিডিপিতে ০.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করবে।

পরিবেশ রক্ষায় সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য গ্রামীণ প্রাকৃতিক জলাধার গড়ে তোলা হবে, যাতে সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের মাধ্যমে গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমকেও বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে সংসদকে জানান সরকারপ্রধান।

এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই পর্যালোচনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য জানান। প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে এর দায় এবং সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন করে আসছে। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, বিস্তার এবং টিকাদান কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়ের প্রভাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়।

টিকা ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং প্রচলিত সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই সম্পাদিত হয়ে থাকে। তবে টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ও সরকারি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ইতোমধ্যে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, টিকা মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ এবং রোগ নজরদারি কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় আরও সুদৃঢ় করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে হামের টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি সংসদকে জানান।

অন্যদিকে, সংসদে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবুর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জামালপুরে কোনো রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) নেই, তবে জেলা সদরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কর্তৃক একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলমান রয়েছে।

জাতীয় সংসদ অধিবেশনে লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জামালপুর জেলাস্থ সদর উপজেলায় (সংসদীয় আসন: জামালপুর-৫) বেজা কর্তৃক প্রথম পর্যায়ে ২৪১.৫৪ একর জায়গায় বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে।

ইতোমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৮টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১১৬ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে ২টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে এবং ৭টি প্রতিষ্ঠান তাদের অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সংসদকে তিনি আরও জানান, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা শীঘ্রই ৬ হাজারে উন্নীত হবে। এর ফলে জামালপুরসহ পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এছাড়া প্রথম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত জামালপুর সদর উপজেলার পার্শ্ববর্তী সুলতান নগর মৌজায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও একটি শিল্প সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে সংসদকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।