নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সেমিট্রির কার্যক্রম শুরু ২০ জুন

বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশীদের বৃহত্তম প্রকল্প এক লাখ কবরের বাংলাদেশ সেমিট্রির যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামি ২০ জুন শনিবার। আর দাফন কার্যক্রম শুরু হবে ১ জুলাই থেকে। দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ এর উদ্যোগে নিউইয়র্ক স্টেটের অরেঞ্জ কাউন্টির স্কচটাউনে সম্পূর্ণ ভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি মেনে গড়ে তোলা সেমিট্রিতে ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

এ উপলক্ষে আয়োজিত মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে সেমিট্রির মুখপাত্র ও দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, সেমিট্রি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্কচটাউনের ২৪০ কনর্স রোডে সম্পূর্ণ নগদ অর্থে ১২৬ একর জায়গা ক্রয় করা হয়। যেখানে এক লাখের বেশী কবর তৈরীর পরিকল্পনা নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই। প্রথম কিস্তিতে ২০ হাজার কবরের জায়গা প্রস্তুত করা হয়, যা ৩০টি সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে। আগামি ২০ জুন এ সকল প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেমিট্রির কার্যক্রম শুরু হবে।

গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির ট্রাষ্টি রফিকুল ইসলাম ভূইয়ার সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি এএসএম মাইনউদ্দিন পিন্টুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সেমিট্রিতে জানাজা পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। কবর খোঁড়া, মরদেহ নামানোসহ সব কাজ মেশিনের মাধ্যমে করা হবে। ইতোমধ্যে সকল যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সপ্তাহে সোমবার থেকে শনিবার (সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত) দাফন কার্যক্রম চলবে। রবিবারও আলোচনাক্রমে দাফন করা যাবে। আপাতত ফিউনারেল হোম সেবা থাকছে না। তবে তাড়াতাড়ি নিউইর্য়ক সিটি এবং সেমিট্রি এলাকায় ফিউনারেল হোম প্রতিষ্ঠা করা হবে।

আরও জানানো হয়, আগামি জুলাই-আগস্ট মাসে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০ হাজার কবর তৈরীর কাজ শুরু হবে। জায়গার দাম ছাড়া শুধু দাফনের জন্য খরচ পড়বে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৫শ ডলার এবং শিশুদের জন্য ১২শ ডলার। হেডস্টোনের খরচ পড়ছে ১ হাজার ২৫০ ডলার। যাদের কবরের জায়গা পূর্বে কেনা থাকবে না তারা কবরের জায়গার জন্য ১ হাজার ডলার প্রদান করতে হবে।

মিট দ্যা প্রেস অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দ, ট্রাস্টি, উপদেষ্টা ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নগদ অর্থায়নে এই সেমিট্রি গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে। দেড় মিলিয়ন ডলার এখনো দেনা (ধার) রয়েছে।

অপপ্রচার মাড়িয়ে দৃশ্যমান “সেমিট্রি”

বাংলাদেশীদের জন্য তথা মুসলমানদের জন্য একক এ সেমিট্রি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতার সন্মুখীত হতে হয় উদ্যোক্তাদের। তার মধ্যে একটি ছিল অপ্রপ্রচার। মামলা হয়েছে, টাউন (স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষ) কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এ প্রজেক্ট হচ্ছে না- এমন অপপ্রচার চাউর করা হয় কমিউনিটিতে। যার ফলে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে অনেকে অনেকভাবে সুযোগ নিতে চেয়েছে। কিন্তু তারা সুযোগ নিতে না পেরে অপপ্রচার করেছন বলে জানিয়ে জাহিদ মিন্টু বলেন, আমরা মনে করি এ অপপ্রচার আমাদেরকে (উদ্যোক্তাদের) আরও শক্তি জুগিয়েছে। কোনভাবে পিছিয়ে দিতে পারেনি। যার ফলে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে এই “সেমিট্রি”।

কমিউনিটিতে সাড়া

বাংলাদেশ সেমিট্রি মুসলমানদের জন্য একক কবরস্থান এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগের কারণে বাংলাদেশীসহ মুসলমান কমিউিনিটিতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। প্রতিদিনই ব্যক্তিগতভাবে কবরের জায়গা কিনতে বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটিতে কেউ না কেউ যোগাযোগ করছেন।

নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের অন্যতম বৃহত্তম সমাজিক প্রতিষ্ঠান জ্যামাইকা কমিউনিটি এলায়েন্সের সেক্রেটারি মাওলানা মানজুরুল কারিম জানান, বাংলাদেশ সেমিট্রি বাংলাদেশী এবং মুসলমানদের জন্য একক বৃহত্তম কবরস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের বুকে এটি বাংলাদেশীদের গর্বের প্রতিষ্ঠান হিসাবে মুখ উজ্জল করবে। কোভিডের সময় কবরের সংকট দেখেছে কমিউনিটি। সেই সংকট থেকে উত্তরণে নোয়াখালী সোসাইটির এই উদ্যোগ প্রসংশনীয়। তাদের সংগঠন ৮শ কবরের জায়গা নিয়েছে সেমিট্রি থেকে।

মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর এসোশিয়েশনের সেক্রেটারি মাসুদ রানা তপন জানান, তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ৫শ কবরের জায়গা নেয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ সেমিট্রির প্রকল্প বাস্তবায়ন হওযায় তারা খুশি। সাধারণত কম্বাইন্ড সেমিট্রি (বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের একসাথে) থেকে জায়াগা কেনা হয়। এটি বাংলাদেশী তথা মুসলমানদের একক কবরস্থান।

কবরের সংকট থেকে স্বপ্ন যাত্রা

কোভিডের সময় কবরের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। গণকবরে সমাহিত করা, কবরের সংকটের কারণে দিনের পর দিন ভ্রাম্যমান মর্গে মরদেহ পড়ে থাকা প্রত্যক্ষ করেছে নিউইয়র্কবাসী। ভয় আর আতংকে স্বজনদের মরদেহ আনতে যায়নি অনেকে। সে সংকটকালীন সময়ে হাসপাতাল থেকে মরদেহ এনে দাফনের ব্যবস্থা করেছেন তখনকার বৃহত্তর নোয়াখালীর সোসাইটির নেতৃবৃন্দ।

দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি ও বাংলাদেশ সেমিট্রির মুখপাত্র জাহিদ মিন্টু বলেন, করোনাকালে একদিকে কবরের সংকট অন্যদিকে কোনভাবে সেমিট্রিগুলোতে শিডিউল পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই দুঃসহ স্মৃতি মাথায় রেখে নিউজার্সির দুটি কম্বাইন্ড সেমিট্রিতে কবরের জায়গা দেখতে যাই আমরা। একটিতে পছন্দ হয়নি, অন্যটিতে ৫হাজার কবর কেনার জন্য কথা হলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। তখন আমরা হন্যে হয়ে কবরের জায়গা খুজতে থাকি, একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিই আমরা নিজেরাই মুসলমানদের জন্য একক কবরস্থান গড়ে তুলবো। সেই স্বপ্ন যাত্রার বাস্তবরূপ হচ্ছে বাংলদেশ সেমিট্রি।

দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটির সেক্রেটারি এএসএম মাইনউদ্দিন পিন্টু, বাংলাদেশ সেমিট্রির কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগীতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। একইসাথে ২০ জুন কার্যক্রম শুরুর দিনে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করেন।