চা বাগানের অব্যবহৃত জমি

সরকারকে নজর দিতেই হবে

দেশের সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত অঞ্চলে চা বাগানের বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপুল অব্যবহৃত জমি, যেগুলোকে বহুমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়। ১৭ জুন দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে নজর দেওয়া হয়েছে সেদিকেই। ওই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চা বাগানের অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনামূল্যে দিলে অন্তত ২০ শতাংশ উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার অত্যন্ত জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য ও ঘাটতির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিকল্প হলো সৌরবিদ্যুৎ। এর সঙ্গে সরকারি খরচে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গ্রিড পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণ করে দেওয়া হলে এই খরচ আরও ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

দেশে মোট ১৭০টি নিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে। চা বোর্ড ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, চা বাগানের জমি শুধু চা উৎপাদনের উদ্দেশ্যেই ব্যবহারের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চা বাগানের অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে বিকল্প ব্যবহারের দাবি উঠেছে এবং ভূমির অবৈধ হাতবদল বা বেদখলের মতো বিষয়গুলো প্রশাসনিক তদন্তের আওতায় এসেছে। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। চা চাষের জন্য জমি ইজারা নিয়েও বাগানের অনেক জমি থেকে যায় চাষের বাইরে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানির প্রসার ঘটানো সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এ নিয়েও বিতর্কের অবকাশ নেই যে, জীবাশ্ম জ¦ালানির উচ্চমূল্য ও ঘাটতির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিকল্প হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নানা পরিকল্পনা ইতিমধ্যে নেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ কিছু হয়নি। সৌরবিদ্যুৎ লোডশেডিং সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জমির সংকট রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানা জমির বাইরে চা বাগানের ও খাস যে জমি রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সেই জমির সুষম ব্যবহার সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের নজর নেই এ তথ্য উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিধি ভেঙে চা বাগানের জমি বন্দোবস্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এগুলো ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার হচ্ছে। অথচ চা বাগান ও খাসজমি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। এ অঞ্চলের কোনো কোনো দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জমি দেওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোও নির্মাণ করে দেয় সরকার। এমনটির অবকাশ আমাদের থাকলেও নেই কোনো পরিকল্পনা। অনেক উদ্যোক্তা আছেন যারা জমি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে শুধু পৃষ্ঠপোষকতাই শেষ কথা নয়, এজন্য সবার আগে জরুরি নীতিমালা।

এমন উদ্যোক্তাও আছেন, যে বা যারা নতুন কোনো পণ্য, সেবা বা ধারণার মাধ্যমে অতি মুনাফার কথা না ভেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যবসা বা উদ্যোগ পরিচালনা করতে আগ্রহী স্বল্প মুনাফায়। এর ফলে কেবল আত্মকর্মসংস্থান নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালনের পথ সুগম হয়। এক তথ্যে জানা যায়, দেশে চা বাগানের আওতাধীন মোট ভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর। এর মধ্যে সরাসরি চা চাষাধীন জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৫৩ একর এবং বাকি ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৮ একর জমি অব্যবহৃত হিসেবে রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত জমি নিয়ে সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে স্থানীয় পর্যায়ে গৃহস্থালি ও চা শিল্পে ব্যবহৃত বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য জোগানদার হতে পারে।

অনালোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে তৎপর হবেন। বন্দোবস্ত নিয়ে যেসব চা বাগান মালিক সব জমি চা চাষে ব্যবহার করেন না, চুক্তির নীতিমালার নিরিখে সেই জমির ব্যাপারে সরকারের ভাবার অবকাশ রয়েছে। কোনো চা বাগানের মালিক যদি কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন, তাহলে সেই বিদ্যুৎ বাগানের উৎপাদনে ব্যবহার করার সুযোগ পেলে জাতীয়ভাবে বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে।