আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে যখন সাধারণ মানুষ চাপে, তখন বিশাল খেরোখাতা নিয়ে হাজির হয়েছে নতুন অর্থবছর। ২০২৬ সালের বাজেট কি গাণিতিক সংখ্যার গোলকধাঁধা, নাকি নতুন অর্থনৈতিক ভোরের ইশারা? বাজেটে রূপান্তরমূলক এবং আধুনিক কিছু নতুন খাতকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তির জন্য বাজেটে বড় অংকের বিশেষ তহবিল রাখা হয়েছে। দেশের তরুণ সমাজকে ফ্রিল্যান্সিং এবং গ্লোবাল টেকনোলজির বাজারে টিকিয়ে রাখতেই এমন উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানি খাতকে বাজেটে মূল স্তম্ভ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, দেশের ভেতরে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ ডিজাইন শিল্পের বিকাশের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে এটি সাহসী পদক্ষেপ। কৃষি খাতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্মার্ট ফার্মিংয়ের জন্য চেইনভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল নীতিমালায় নতুন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, চিকিৎসা গবেষণায় দেশীয় বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করতে তৈরি করা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র গবেষণা ফান্ড। এই নতুন খাতগুলো স্পষ্ট করে যে, সরকার এখন সনাতন অর্থনীতি থেকে বের হয়ে একটি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কাঠামোর দিকে যেতে চাইছে। নতুন খাতগুলোতে প্রযুক্তি আধুনিকায়নের ফলে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক গতি পাবে। সেমিকন্ডাক্টর ও এআই খাতে নতুন বিনিয়োগের ফলে হাজার হাজার দক্ষ তরুণের জন্য উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। গ্রিন এনার্জিতে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কমবে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে। এটি পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্য খাতে খরচ কমিয়ে দেবে। কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। চিকিৎসা গবেষণার নতুন ফান্ডের কারণে, ক্যানসার বা জরায়ু রোগের মতো জটিল চিকিৎসার ওষুধ দেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে। তবে কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে যারা অদক্ষ বা স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক, তারা কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। যদি সঠিক সময়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া না যায়, তবে সমাজে ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে। চাল, ডাল, তেল ও ডিমের মতো নিত্যপণ্য মূল্য যখন চড়া, তখন এই বাজেট সাধারণ মানুষের পেটের ক্ষুধা কতটুকু মেটাবে? সরকার বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স ছাড় দিচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়ের সীমা তেমন বাড়ানো হয়নি। তৃণমূলের নারীরা এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিনের মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পণ্যে উচ্চ শুল্ক গুনছেন। উন্নত দেশগুলো যেখানে এই পণ্যগুলো বিনামূল্যে দিচ্ছে, সেখানে বাজেটে তাকে বিলাসী পণ্য বানানো হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক নীতি প্রমাণ করে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পুরোপুরি ভাঙেনি। বাজেট যেন ধনীদের আরও ধনী করা এবং গরিবের পকেট কাটার এক বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাখতে হয় তাই রাখা হচ্ছে, এই মানসিকতা দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন কোনো দিন সম্ভব নয়। বিভিন্ন সংকট কাটিয়ে উঠে, ২০২৬ সালের বাজেটকে সফল করতে হলে সরকারকে কিছু বাস্তবসম্মত সমাধান ও পরামর্শের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, এআই বা সেমিকন্ডাক্টর খাতের বরাদ্দ যেন কেবল ঢাকা বা বড় শহরের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে এই প্রযুক্তির ল্যাব তৈরি করতে হবে। ঝরে পড়া তরুণদের জন্য বিনামূল্যে কোডিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বাজেটের টাকা থেকেই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ নারীর মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সব পণ্যের ওপর থেকে সব ধরনের ভ্যাট এবং শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত। প্রতিটি সরকারি স্কুল এবং কলেজে ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে প্যাড সরবরাহ করার জন্য বাজেটে বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টিসিবির মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহরের নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য রেশন কার্ডের পরিধি দ্বিগুণ করতে হবে। ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের যে তহবিল, তা যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে। কর্মজীবী মায়েদের সুবিধাথের্, প্রতিটি শিল্পাঞ্চল ও সরকারি অফিসে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের জন্য কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়া উচিত।
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে কিছু ইতিবাচকতা আছে। সরকার প্রযুক্তির আধুনিকায়নকে স্বীকার করেছে, এটিই বড় মানসিক পরিবর্তন। বাজেট যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশ বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়াতে পারবে। বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা গবেষণার সুযোগ পেলে, স্বাস্থ্য খাতের আমদানি নির্ভরতা অনেক কমবে। তরুণ সমাজ যদি ফ্রিল্যান্সিং খাতের নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারে, তবে দেশে রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ অনেক বাড়বে। ডিজিটাল অর্থনীতির এই সুফল যখন প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তখন জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে বাধ্য। এই বাজেট আমাদের অর্থনীতিকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট যুগে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়।
দুর্নীতি এবং অপচয় রোধ করতে না পারলে, এই বাজেট সাধারণ মানুষের কাজে আসবে না। সরকারকে মনে রাখতে হবে, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীকে বাদ দিয়ে, স্মার্ট বাংলাদেশের রূপকল্প সফল হবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি বাজেট যেন নাগরিকদের শান্তিতে বাঁচার অধিকারকে সুরক্ষিত করে। সবার ঊর্ধ্বে, বাজার ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির গতি বাড়ানো দরকার।
লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড