নজর কাড়ুক সমুদ্র তলদেশ

অনস্বীকার্য যে, ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। বাংলাদেশের অধিকারে থাকা প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা ও ৭২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে দেশে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে সমুদ্র অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুদ দিয়ে, দেশ ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে আগামী দিনের জ্বালানি-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমুদ্র সম্পদকে যথাযথ আহরণ-ব্যবহার-রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে উঁচুমার্গে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের বহু দেশ সমুদ্রসম্পদ আহরণ করে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে সক্ষম হলেও, বাংলাদেশ এখনো অনেকাংশে পিছিয়ে আছে বিশেষ করে, বিশ্ব উন্নয়নের তুলনায়। কারণ জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রমও প্রায় স্থবির-গতিহীন। দক্ষ জনবলের অভাবও প্রকট। ফলে  সমুদ্র সম্পদ এখনো বহুলাংশে অনাবিষ্কৃত-অব্যবহৃত।

সীমিত পর্যায়ে যে পরিমাণ তেল-গ্যাস এবং মৎস্যসম্পদ আহরিত হচ্ছে, যার পরিমাণ বঙ্গোপসাগরে থাকা অফুরন্ত সম্পদের তুলনায় অতি নগণ্য। বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ৪-৫ শতাংশ আসে সমুদ্র অর্থনীতি থেকে। এর পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ৯৬০ কোটি ডলার। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও তার তলদেশের সম্পদ আহরণ করে টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জাতীয় আয় বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সমুদ্র থেকে শুধু মাছ রপ্তানি থেকেই বছরে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশের সমুদ্রবিষয়ক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বঙ্গোপসাগর থেকে ৮০ লাখ টন মাছ ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছে মাত্র ৭ লাখ টন মাছ। দেশে বছরে যে পরিমাণ মাছ আহরণ হয়, তার মাত্র ১৫ শতাংশ আসে গভীর সমুদ্র থেকে। উপকূলীয় এলাকায় ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। অর্থনীতিবিদদের দাবি, সমুদ্র অর্থনীতিকে যদি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া যায় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী বিপ্লব সাধিত হবে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমার তলদেশে যে সম্পদ রয়েছে, তা টেকসই উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা মাফিক ব্যবহার করা গেলে, ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে আড়াই লাখ কোটি ডলার আয় সম্ভব।

বেলজিয়ামের অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাওলি ১৯৯৪ সালে ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ধারণা ব্যক্ত করেন। মূলত সুনীল অর্থনীতি হলো, সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি। সমুদ্র থেকে আহরণকৃত সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হলে তা সুনীল অর্থনীতি হিসেবে বিবেচ্য। সহজ কথায় সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা সুনীল অর্থনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য। চলমান বৈশ্বিক মন্দায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশেও সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনার হাতছানি দেশবাসীকে করছে উদ্বেলিত। বিভিন্ন গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে যে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে চারটি মৎস্য ক্ষেত্র। সেখানে ৪৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৩ প্রজাতির তিমি, ১০ প্রজাতির ডলফিনসহ প্রায় ২০০ প্রজাতির সামুদ্রিক ঘাস রয়েছে। আরও রয়েছে ইসপিরুলিনা নামক সবচেয়ে মূল্যবান আগাছা। অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে খনিজ ও খনিজ জাতীয় সম্পদ, যেমন তেল, গ্যাস, চুনাপাথর ইত্যাদি। এ ছাড়া রয়েছে জিরকন, রুটাইল, সিলিমানাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট, কায়ানাইট, মোনাজাইটসহ ১৭ ধরনের মূল্যবান খনিজ বালি। যার মধ্যে মোনাজাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রসৈকতের বালিতে মোট খনিজের মজুদ ৪৪ লাখ টন। প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন। যা বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে পাওয়া গেছে। গবেষকরা বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় ম্যারিন জেনেটিক রিসোর্সের অবস্থান এবং বিবিধ প্রজাতি চিহ্নিত করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলাদেশের কিছু প্রজাতির সি-উইডে প্রচুর প্রোটিন আছে, যা ফিশ ফিড হিসেবে আমদানি করা ফিশ অয়েলের বিকল্প হতে পারে। আবার কিছু প্রজাতি অ্যানিমেল ফিডের মান বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হতে পারে। কসমেটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত উপাদান সদৃশ এমন সিউইডও অনেক পাওয়া গেছে।  বিশ্ব অর্থনীতিতে, সুনীল অর্থনীতির বহুমাত্রিক অবদান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকা- হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্বের ৪৩০ কোটিরও বেশি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদ্রনির্ভর। দ্য জাকার্তা পোস্টে প্রকাশ পাওয়া নিবন্ধ সূত্রমতে, দ্য লমবক ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়ন কর্মসূচি ৭৭ হাজার ৭০০ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা প্রবল। পাশাপাশি প্রতি বছর আয় করবে ১১৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালে তাদের মোট দেশজ উৎপানে সুনীল অর্থনীতির অবদান পরিমাপের চেষ্টা চালায়। ২০১৩ সালে দেশটির অর্থনীতিতে সমুদ্র অর্থনীতির অবদান ছিল ৩৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা তাদের মোট জিডিপির ২ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্র সম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৭ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া এ খাত থেকে, ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

ইতিমধ্যে চীনের অর্থনীতিতে, ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামুদ্রিক শিল্প বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ চীনের জিডিপিতে সামুদ্রিক খাতের অবদান হবে ১৫ শতাংশ। এ ছাড়াও চীন, জাপান, ফিলিপাইনসহ বেশ কিছু দেশ ২০০ থেকে ৩০০ বছর আগেই সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে মনোনিবেশ করেছিল। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত উপযোগী। প্রতিবেদন মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় দেশ ও দ্বীপের সরকারগুলো অর্থনীতির নতুন ফ্রন্ট হিসেবে সমুদ্র সম্পদের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে। সমুদ্র অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে দেশের প্রবৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র বা নীল অর্থনীতির অবদান প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। আয়ের সর্বোচ্চ অংশ আসে পর্যটন ও বিনোদন খাত থেকে। যার পরিমাণ ২৫ শতাংশ। মৎস্য ও যাতায়াত উভয় খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ২২ শতাংশ।

গ্যাস ও তেল উত্তোলন থেকে আয় ১৯ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, ব্লু ইকোনমির চারটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করলে বছরে বাংলাদেশের পক্ষে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব। এই চারটি সেক্টর হলো তেল ও গ্যাস উত্তোলন, মৎস্য আহরণ, বন্দর সম্প্রসারণ এবং পর্যটন। এই খাতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। বাংলাদেশ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং সামুদ্রিক সম্পদের সুরক্ষার মধ্যে, টেকসই ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদসহ বিশাল সমুদ্র অঞ্চলকে কাজে লাগাতে সুনীল অর্থনীতির বিকাশে দ্রুত নজর দিতে হবে।

বিগত বছরগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যত আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে, তার সবটিতেই সুনীল অর্থনীতি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। অর্থনৈতিক সহায়তা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি), জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি), বিশ্বব্যাংক, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট-বড় অনেক উন্নত দেশ সুনীল অর্থনীতিনির্ভর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধিতে নিয়ে সমুদ্রকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ২৬টি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলো হলো শিপিং, উপকূলীয় শিপিং, সমুদ্রবন্দর, ফেরির মাধ্যমে যাত্রীসেবা, অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবহন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প, মৎস্য, সামুদ্রিক জলজ পণ্য, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি, তেল ও গ্যাস, সমুদ্রের লবণ উৎপাদন, মহাসাগরের নবায়নযোগ্য শক্তি, ব্লু এনার্জি, খনিজ সম্পদ (বালি, নুড়ি ও অন্যান্য), সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ, উপকূলীয় পর্যটন, বিনোদনমূলক জলজ ক্রীড়া, ইয়টিং ও মেরিনস, ক্রুজ পর্যটন, উপকূলীয় সুরক্ষা, কৃত্রিম দ্বীপ, সবুজ উপকূলীয় বেল্ট বা ডেল্টা পরিকল্পনা, মানবসম্পদ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক সমষ্টি স্থানিক পরিকল্পনা (এমএসপি) ইত্যাদি।  

দেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সমুদ্র সম্পদ আহরণের নতুন নতুন পন্থা উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরি। নবতর কর্মকৌশল প্রণয়ন ও আশু-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি প্রায়োগিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান করা না গেলে, সমুদ্র অর্থনীতি থেকে কার্যকর প্রবৃদ্ধি অর্জন দীর্ঘায়িত হবে। ন্যূনতম অবজ্ঞা-অবহেলা পরিহার করে, তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের উন্নয়নে সচল অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় সমুদ্র সম্পদ আহরণের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে কালক্ষেপণ না করে এক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া সময়ের দাবি। বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক সংকটের আবর্তে দেশীয় সমস্যাগুলো সমাধানে সমুদ্র সম্পদের আকর্ষণীয় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনাকে অবজ্ঞা করা উচিত হবে না।

লেখক :  সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

chowiu@yahoo.com