বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলে তারা জনগণের বন্ধু নয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের অর্থ কোনোভাবেই বিদেশে পাচার হতে দেওয়া হবে না; বরং তা জনগণের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। যারা এ দেশ থেকে জনগণের অর্থ বিদেশে পাচার করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বুধবার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারপ্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সরকারের কল্যাণমূলক উদ্যোগে যারা বাধা দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণের জন্য যেই বাজেটে সব ব্যবস্থা রেখেছি, সেই বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলে, তারা কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেন ফ্যামিলি কার্ডের টাকা কোথা থেকে আসবে, কৃষক কার্ডের টাকা কোথা থেকে আসবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জনগণের অর্থ জনগণের জন্যই ব্যয় করা হবে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে জনগণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। আমরা সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে চাই। আমরা যদি সবাই চোখ-কান খোলা রাখি, তাহলে এ দেশের অর্থ কেউ বিদেশে পাচার করতে পারবে না। আমরা সবাই মিলে পরিশ্রম করব এবং সেই অর্থ দিয়ে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব।’ চা শ্রমিকদের ঘর নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বৃত্তি এবং অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা সহায়তা জনগণের অর্থ দিয়েই দেওয়া হচ্ছে। জনগণের কল্যাণে সরকারের এ ধরনের কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনের অনুষ্ঠানে এদিন প্রধানমন্ত্রী ১৫৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১০ জন নারীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। পরে কম্পিউটারে বাটন চেপে ফ্যামিলি কার্ড তৃতীয় পর্যায় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে চা শ্রমিক আবাসন সমস্যা সমাধানে শ্রমিকদের ২ লাখ টাকা করে অনুদান, চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি প্রদান, প্রতিবন্ধীদের জন্য আর্থিক অনুদানের চেকও প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারাভিযান সিলেটের মাটি থেকে শুরু করেছিলেন। সে সময় হবিগঞ্জে দেওয়া নির্বাচনী বক্তব্যে চা বাগানের নারী শ্রমিকদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পেরে আজ তিনি আনন্দিত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বর্তমানে সীমিত পরিসরে কর্মসূচি চালু হলেও আগামী এক বছরের মধ্যে প্রায় সব নারী চা শ্রমিকের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, সদ্য উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের ৪০ লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড এবং ৪০ লাখ পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। সে লক্ষ্যেই আমরা নারীদের স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড এবং শিক্ষার্থী, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি।’

বিএনপিকে গণমানুষের দল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি  সবসময় জনগণের কাতারে ছিল, সেজন্যই বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের শক্তি। সেই জন্যই বিএনপি সবসময় বলে থাকে জনগণই আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস। যতবার ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে দেশের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এনেছে।’

বাজেট নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কল্যাণে প্রণীত বাজেটকে কেউ কেউ ‘গণবিরোধী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ এই বাজেটেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে ব্যাপক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেই বাজেট জনগণের বাজেট, যেই বাজেটের মাধ্যমে আমরা জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, সেই বাজেটকে তারা চানাচুরের সঙ্গে তুলনা করে, সেই বাজেটকে তারা বলে গণবিরোধী বাজেট! বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলে, তারা কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারে না।’

সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন তাহলে আজকের এই আনন্দের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হবে, আমাদের প্রতিশ্রুতি হবে একটাই করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ এবং একই সঙ্গে আরেকটা নতুন কথা বলি, করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’

বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানে একটি জাম ও কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন।

সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম নয়ন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস এবং ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নারীদের মধ্যে শিউলী রানী দাস ও ওয়াজেদা বেগম বক্তব্য রাখেন।

ঝড়ো হাওয়ায় ভেঙে পড়ে প্যান্ডেল, মঞ্চের ছাদে জমে পানি : প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সমাবেশস্থলে সকাল থেকেই জড়ো হন হাজারো চা শ্রমিক, দলীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। এরই মধ্যে অনুষ্ঠান শুরুর আগে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিতে প্যান্ডেলের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো প্যান্ডেল খুলে ফেলতে হয়। ফলে হাজারো উপকারভোগী, অতিথি ও দর্শনার্থীকে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি ও রোদের মধ্যে অবস্থান করতে হয়েছে। যদিও বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, অনেকেই অল্পের জন্য আহত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পান।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের কিছুক্ষণ আগে থেকেই মঞ্চের ওপর টানানো ত্রিপলের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমতে শুরু করে। কর্মীরা বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে সেই পানি সরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পানি মঞ্চের ভেতরেও পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির সময়ও মঞ্চে পানি চুইয়ে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়, যা অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ঢাকার একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানস্থলের অবকাঠামোগত কাজ করেছে। প্যান্ডেল ভেঙে পড়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’