দীর্ঘ সংঘাতের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় উপনীত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে স্বস্তি ফিরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইলেকট্রনিক উপায়ে গত রবিবার একটি চুক্তি সই করেছেন। আগামী শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানের পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সে লক্ষ্যে শুক্রবার পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এখনো চুক্তিটির চূড়ান্ত পাঠ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যেই গতকাল বুধবার ইরানকে আবারও হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চলতি সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি চূড়ান্ত নয় এবং এটি তার পছন্দ না হলে আবারও বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারেন। ফ্রান্সে চলমান জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। ইরানকে খোলাখুলি হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, চুক্তি পছন্দ না হলে এবং ইরান ভালো ব্যবহার না করলে আমরা নিশ্চিতভাবেই আবারও বোমা ফেলা শুরু করব।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই চুক্তিতে তেহরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের তহবিলের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমরা এই তহবিলে ১০ সেন্টও দিচ্ছি না। আমরা কোনো বিনিয়োগ করছি না এবং আমাদের এমন কোনো তহবিলও নেই’। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানে বিনিয়োগ করবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি তাদের বিনিয়োগ করতে বলছেন না, তবে তারা যদি তা করতে চায়, তবে করুক, এতে আমার সমস্যা নেই। এর আগে, চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছিল, তেহরানে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রূপরেখা চুক্তিতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই তহবিলের অর্ধেকের বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। সূত্রটি বলেছে, উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়াটা এ তহবিল গড়ার উদ্দেশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, ওয়াশিংটন ও তেহরান আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া প্রাথমিক চুক্তি এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। টেলিফোন সংলাপে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত বিবরণ জানান। একই সঙ্গে তিনি লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসন ‘সম্পূর্ণরূপে বন্ধ’ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ এই চুক্তির পাঠ্য চূড়ান্ত হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি চুক্তিটি বাস্তবায়নে রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ফোনালাপকালে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি এই সমঝোতা স্মারককে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন তারা।
অন্যদিকে, যুদ্ধ অবসানে একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছানোর পর ইরানের তেল বহনকারী চারটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধসীমা অতিক্রম করেছে। তেল পরিবহন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ট্যাংকার ট্র্যাকার্স বুধবার জানায়, ডিজিটাল ট্র্যাকিং তথ্য এবং স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে যাচাই করে তারা ইরানের ‘দুই মাসের মধ্যে প্রথম অপরিশোধিত তেল রপ্তানি’ শনাক্ত করেছে। ট্যাংকার ট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) দুটি ট্যাংকার ডিওনা এবং হিরো গত মঙ্গলবার অবরোধসীমা অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়। এসব জাহাজে মোট ৩৮ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল ছিল। একই সময়ে আরেকটি ট্যাংকার স্ট্রিম বুধবার ইরানের বন্দরগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এ ছাড়া এনআইটিসি পরিচালিত আরও একটি ট্যাংকার যাতে ১০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ছিল, বুধবার ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধসীমা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে ট্যাংকার ট্র্যাকার্স।