বাবার মঞ্চে ছেলের মহাকাব্য

চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বুন্দেসলিগা কিংবা প্রিমিয়ার লিগ; অভিষেক মঞ্চেই গোল করাকে যেন নিয়মে পরিণত করেছেন আর্লিং হালান্ড। তবে বিশ্বমঞ্চের চাপটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেই পরীক্ষার মঞ্চটি যদি হয় ৩২ বছর আগে বাবার খেলে যাওয়া চেনা মাঠ, তবে রোমাঞ্চ অন্য মাত্রা নেয়। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে নরওয়ের জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন আলফ-ইঙ্গে হালান্ড। ঠিক তিন দশক পর, ২০২৬ সালে সেই যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে নামল নরওয়ে। বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে ইরাককে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে জোড়া গোল করে বাবার সেই স্মৃতিবিজড়িত মঞ্চে নিজের রাজসিক অভিষেক উদযাপন করলেন ২৫ বছর বয়সী হালান্ড।

বিশ্বকাপের ষষ্ঠ দিনে ফুটবল বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত দ্বৈরথ দেখল। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টা পরই মাঠে নামেন হালান্ড। এমবাপ্পের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ লুফে নিতে একদমই সময় নেননি এই ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। ম্যাচের শুরুতে কিছুটা নার্ভাস থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চেনা খুনে মেজাজে ফেরেন তিনি। ম্যাচের ২০তম মিনিটে হুলিয়ান রাইয়ারসনের ক্রস থেকে সহজ সুযোগ হাতছাড়া করলেও ২৯তম মিনিটে আর ভুল করেননি। বাম দিক থেকে ডেভিড মোলার উলফের নিচু ক্রস বক্সে আসামাত্রই ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে পেছনের পোস্টে সøাইড করে বল জালে জড়ান হালান্ড। এটি ছিল দীর্ঘ ১০,২২০ দিন পর বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রথম গোল। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯৮ সালে নরওয়ের সর্বশেষ বিশ্বকাপ গোলের ৭৫৯ দিন পর জন্ম হয়েছিল হালান্ডের!

তবে নরওয়ের এই আনন্দ ১০ মিনিটের মাথায় স্তব্ধ করে দেয় ইরাক। ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা দলটি ৪১তম মিনিটে আমির আল আম্মারির ক্রস থেকে আয়মান হুসেইনের দুর্দান্ত হেডে সমতায় ফেরে। কিন্তু গোলমেশিন হালান্ডকে দমানো কি এতই সহজ? বিরতির ঠিক দুই মিনিট আগে, ৪৩তম মিনিটে ইরাকি ডিফেন্স ও গোলরক্ষক জালাল হাসানের মারাত্মক ভুলের ফায়দা তোলেন তিনি। সতীর্থের দেওয়া দুর্বল ব্যাক-পাস ক্লিয়ার করতে গোলরক্ষক সামান্য দেরি করতেই চিতার গতিতে হাই-প্রেসিংয়ে ছুটে যান হালান্ড। চাপের মুখে গোলরক্ষকের নেওয়া শটটি সরাসরি হালান্ডের হাঁটুতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। প্রথমার্ধে মাত্র ১১ বার বল ছুঁয়েই দুই গোল আদায় করে নরওয়েকে লিড এনে দেন এই মহাতারকা। তাই তো ম্যাচ শেষে ইরাকের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডও হালান্ডকে জড়িয়ে ধরে বলতে বাধ্য হন, ‘তুমি আমার দেখা অন্যতম সেরা নাম্বার নাইন। ও এতটাই শক্তিশালী ও ক্ষিপ্র যে, যেকোনো ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দিতে পারে।’

এই জোড়া গোলের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে হালান্ডের গোল সংখ্যা দাঁড়াল ৫১ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৫৭-তে! গোল করার এই অতিমানবীয় হার ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি জার্ড মুলার কিংবা পুসকাসদেরও ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার গতি কিছুটা কমলেও ৭৬ মিনিটে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের কর্নার থেকে বদলি খেলোয়াড় লিও আস্টিগোরের নিখুঁত হেডে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নরওয়ে। আর ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে ইনজুরি টাইমের সপ্তম মিনিটে নরওয়ের আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন ইরাকের প্রথমার্ধের গোলদাতা আয়মান হুসেইন।

এই আত্মঘাতী গোলে ৪-১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে নরওয়ে। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে হালান্ড বলেন, ‘অভিষেক ম্যাচ জেতা সবসময়ই কঠিন। আমরা হয়তো আমাদের সেরা ফুটবলটা খেলিনি, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে গড়পড়তা দিনেও ৪-১ ব্যবধানে জয় পাওয়াটা বিশাল ব্যাপার। আমি আমার দল ও দেশের জন্য গর্বিত।’