প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপর আমার সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, উন্নত বাহিনী হিসেবে সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য এসএসএফের প্রতি আহ্বান জানাই। গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
এসএসএফ সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবেন। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনগণ যাতে দুর্ব্যবহারের শিকার না হয়, সেদিকেও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রতিষ্ঠাকালীন এসএসএফ আর বর্তমান সময়ের এসএসএফের মধ্যে অনেক পার্থক্য উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে এসএসএফের পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আজ থেকে ৪০ বছর আগে সময়ের প্রয়োজনে এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ১৯৯১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তন করে ‘এসএসএফ’ নামে এই বিশেষ বাহিনী যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন এবং আছেন সবাইকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানাই।
এসএসএফের ভূমিকার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিভিন্ন মেয়াদে সরকারপ্রধান থাকাকালে এবং জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় এসএসএফ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জানাজা আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এসএসএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এসএসএফের কার্যক্রম সরাসরি প্রত্যক্ষ করছি। এ কার্যক্রমের সঙ্গে আমার পরিচয় নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন থেকেই এসএসএফের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত। তিনি বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য বিএনপি জনগণের রায় পায়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রপরিচালনা করছে। রাষ্ট্রীয় নিয়মানুযায়ী, সরকারপ্রধানের জন্য এসএসএফ সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করে সড়কে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গাড়িবহরের আকার সীমিত করেছি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে এসএসএফকে দক্ষতা ও নিরাপত্তা কৌশলের ওপর বেশি জোর দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়ই জনসভা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। এ ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিছুটা জটিল। একদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা, অন্যদিকে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখা দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এসএসএফকে নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এসএসএফের কর্মদক্ষতাও প্রতিভাত হয়ে ওঠে।
এসএসএফের নবনির্মিত অত্যাধুনিক ফায়ারিং রেঞ্জের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেশাগত কর্মদক্ষতা বাড়াতে নবনির্মিত এই ফায়ারিং রেঞ্জ নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। রেডবুকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০২ সালের পর এসএসএফের ‘রেডবুক’ পুনরায় সংস্কার করে বর্তমানে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করা হয়েছে। এটি এসএসএফের কর্মপদ্ধতির নীতিমালা প্রদানের পাশাপাশি আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে।
তিনি বলেন, এসএসএফের মতো বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব এবং সর্বোপরি ‘চেইন অব কমান্ড’-এর বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং দেশ-বিদেশে রাষ্ট্রঘোষিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। নিরাপত্তাব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে দেশের অন্য নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এসএসএফকে নিরাপত্তা কৌশল নিশ্চিত করতে হয়। সমন্বয় যত বেশি করা যায়, নিরাপত্তাব্যবস্থাও ততবেশি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাই করেই এসএসএফ গঠন করা হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার ওপর আপনাদের দেশ-বিদেশে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসএফকে আরও কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তিনি। এসএসএফ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে, দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আপনারা সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।