হাসপাতালই তার ঘরবাড়ি

বয়স মাত্র আড়াই বছর। এই সময়টায় শিশুসুলভ আচরণে ঘর মাতিয়ে রাখার কথা তার, কিন্তু ঘরেই থাকা হয়নি এক রকম। জন্মের আড়াই বছরের মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসায় থাকা হয়েছে মাত্র তিন মাস। আর সোয়া দুই বছর ধরে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছে সে। বলতে গেলে হাসপাতালই এখন তার ঘরবাড়ি। বর্তমানে তার ঠিকানা রাজধানীর শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউট। সেখানে হাম ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে বাঁচার প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে শিশু আফিফা। এরই মধ্যে ১০ বার আইসিইউতে যেতে হয়েছে তাকে। একবারে সর্বোচ্চ ১৮ দিন শিশু আইসিইউতে থাকতে হয়েছে। কিন্তু জীবনযুদ্ধ এখনো থামেনি। কবে থামবে, কবে হাসপাতাল ছাড়বে আর কবে বাবা-মায়ের কোলে চড়ে বাসায় ফিরবে তার কোনো ঠিক নেই।

২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর মাদ্রাসাশিক্ষক মাওলানা আব্দুর রশীদ ও মাহমুদা আক্তারের ঘর আলো করে আসে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান।

নাম রাখা হয় আফিফা। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের আনন্দের সীমা ছিল না। আফিফার হাত-পা নাড়ানাড়ি, হাসি-কান্না সবকিছুই বাবা-মায়ের কাছে বেশ উপভোগ্য হতে থাকে। কিন্তু তাদের সেই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দেড় মাসের মাথায় আফিফার হার্টে ছিদ্র ধরা পড়ে। পরে আরও জটিল রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়।

মাওলানা আব্দুর রশীদ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়ারপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। গাজীপুরের হেমায়েতপুরে ঝাউচর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। আফিফার বাবা আব্দুর রশীদের সঙ্গে শিশু হাসপাতালে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এ সময় গত সোয়া দুবছর ধরে তার জীবনে বয়ে চলা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা জানান। বলেন, গত সোয়া দুবছর হাসি-আনন্দ সবই হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। আফিফার অসুস্থতা সবই কেড়ে নিয়েছে বলতে বলতেই চশমা খুলে আব্দুর রশীদ হাত দিয়ে চোখের পানি মোছেন। তিনি বলেন, পা আর চলে না, রেস্ট পাই না এক মুহূর্তও। শরীর অবশ হয়ে যায়। আফিফার কথা মনে হলে আবার টেনেটুনে চলতে হয়।

আফিফার অসুস্থতা প্রথমে সাধারণ অসুখ হিসেবে ধরে নেন আব্দুর রশীদ। তাই বেগমগঞ্জে স্থানীয়ভাবে ঝাড়ফুঁক, হোমিও ও হেকিমি চিকিৎসা করা হয়। এসবে উন্নতি না হওয়ায় বড় ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আব্দুর রশীদ শিশু আফিফাকে নিয়ে ঢাকায় আসেন।

প্রথমে আফিফাকে বনশ্রীর ফরায়েজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে ঢাকার বেসরকারি বিশেষায়িত স্কয়ার হাসপাতালেও নেওয়া হয়। আট দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে ডা. শুক্লা পরামর্শ দেন আফিফাকে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার। স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউ ব্যয়-বহুল জানিয়ে চিকিৎসক আফিফাকে শিশু হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী তাকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান বাবা। কিন্তু ভর্তি নেয়নি। সেখান থেকে জানানো হয়, এখানকার ডাক্তাররা কাঁঠালবাগানে পদ্মা হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেন।

বিলম্ব না করে আফিফাকে নিয়ে পদ্মা হাসপাতালে ছুটেন আব্দুর রশীদ। সেখানে ডা. আতিকুর রহমানের অধীনে ভর্তি করা হয়। সেখানেও তার অবস্থার অবনতি ঘটে। ফরায়েজি, স্কয়ার ও পদ্মা হাসপাতাল ঘুরে ২০২৪ সালের মে মাসের প্রথম দিকে আফিফাকে শ্যামলী শিশু হাসপাতাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয় ডা. প্রবীর কুমার সরকার ও ডা. জোহরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে। সেই থেকে দুবছরের বেশি সময় এই হাসপাতালেই চলছে আফিফার চিকিৎসা। মাঝে দু-এক দিনের জন্য ছাড়া হলেও অবস্থার অবনতি ঘটে, আবার ফিরে আসতে হয় হাসপাতালে। তাই আফিফার বাবা আব্দুর রশীদ শ্যামলীতে এক রুমের একটি বাসা নিয়ে বসবাস শুরু করেছেন।

আব্দুর রশীদকে চিকিৎসক অধ্যাপক প্রবীর কুমার সরকার জানান আফিফার হার্টে ছিদ্র রয়েছে। সেটি সারিয়ে তুলতে যথারীতি চিকিৎসা শুরু হয়। এরপর তার শরীরে ধরা পড়েছে নানা রোগ। নিউমোনিয়া, খাদ্যনালি ক্ষত, সিএমভি পজিটিভ, প্লাটিলেট ওঠানামা, এমনকি ক্যানসারের উপসর্গও তার শরীরে ধরা পড়ে। আছে নাকে ও গলায় টিউমার। সর্বশেষ হামে আক্রান্ত হয়েছে আফিফা। শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে থাকতে হয়েছে তাকে। সেখানে সাত দিন ধরে হামের সঙ্গে লড়াই করেছে। গত ১১ জুন বৃহস্পতিবার আইসিইউ থেকে হাম ওয়ার্ডের ২৪ নম্বর বেডে দেওয়া হয়েছে তাকে। এর মধ্যে লিভার আক্রান্ত হয়ে পেট ফুলে উঠেছে তার। হামের উচ্চমাত্রার ডোজ লিভার ড্যামেজ হতে পারে, পরিবারকে জানান চিকিৎসকরা। সন্তানকে সুস্থ করতে চেষ্টার কোনো কমতি নেই বাবা আব্দুর রশীদের।

আব্দুর রশীদ জানান, ইতিমধ্যে আফিফার চিকিৎসাব্যয় ৪০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। সন্তানকে বাঁচাতে নিজের সহায়-সম্বল খুইয়েছেন। এ ছাড়া মায়ের হজের টাকাসহ ধার-দেনা করে এই বিশাল চিকিৎসাব্যয় সামলাতে হয়েছে তাকে। আফিফার জীবন-মৃত্যু অনিশ্চিত হলেও প্রতিদিন সাড়ে ৬ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে চিকিৎসায়। ওষুধ, বেড ভাড়া, অক্সিজেন ও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতিদিন এই টাকা খরচ হয়। বড় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আলাদা খরচ। তবে আইসিইউতে ঢুকলেই গুনতে হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই মুহূর্তে তার একটাই চাওয়া, আদরের কন্যাসন্তানকে সুস্থ করে বাড়ি যাবেন একসঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জোহরা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশু আফিফা আমাদের অনেক পুরনো রোগী। সম্ভবত তিন-চার মাস বয়স থেকেই এখানে তার চিকিৎসা চলছে। তার অবস্থা জটিল। অনেক রোগে আক্রান্ত। সর্বশেষ হাম হয়েছে। আফিফা ঝুঁকিপূর্ণ, তবে আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছে।

আব্দুর রশীদ গতকাল বৃহস্পতিবার আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাঝেমধ্যে মনে হয়, এ লড়াই কখন শেষ হবে। না কী আমিই আগে পৃথিবী থেকে চলে যাব! মায়ের হজের ৬ লাখ টাকা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করি। এরপর শ^শুরের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ধার নিই। তাতেও না মেটায় স্ত্রী ও মায়ের স্বর্ণালংকার বিক্রি করে ৬ লাখ, তারপর নিজের ও স্ত্রীর জমানো ৫ লাখ, বন্ধুবান্ধব থেকে আরও ৫ লাখ, মাদ্রাসা থেকে হাদিয়াবাবদ পাওয়া প্রায় ৭ লাখ, ছোট ভগ্নিপতি থেকে আড়াই লাখ, বড় ফুফা থেকে জমি বিক্রিবাবদ আরও দেড় লাখ টাকা আফিফার চিকিৎসার পেছনে খরচ করেন আব্দুর রশীদ।

মাসের পর মাস হাসপাতালে। এ হাসপাতালের আনাচে-কানাচে আমার চেনা হয়ে গেছে। কখনো বারান্দায়, কখনো মাঠে রাত কাটাই। কষ্টের শেষ নেই। এখানে ডাক্তার, নার্স, আয়া সবাই আমাকে চেনে। সবাই আফিফার সুস্থতা চায় বলেন আব্দুর রশীদ। এ সময় নিজের পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এ দুটি পা আর চলে না। ঢুকরে কেঁদে উঠে বলেন, আফিফা হাঁটতে চায়, কথা বলতে চায়, অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘুরতে চায় পারে না...।

দীর্ঘ চিকিৎসা সম্পর্কে আব্দুর রশীদ বলেন, দেশে রেখে চিকিৎসা করানোর অন্যতম কারণ হলো চিকিৎসা যখন শুরু হয়, তখন মনে হতো এই তো সুস্থ হয়ে উঠবে আফিফা। এই করে করে দেশেই চিকিৎসা করিয়েছি। লাখ লাখ টাকা খুইয়েছি। এখন চিকিৎসকরা দেশের বাইরে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসার কোনো সামর্থ্য নেই। এরই মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে তার ১০ মাসের শিশু আবরারও হাম আক্রান্ত। গত শনিবার আবরারকেও একই হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। আব্দুর রশীদ গতকাল জানান, আইসিইউতে তার অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।