ব্রাজিলের সামনে বাঁচা-মরার লড়াই

বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। যারা বিশ^কাপের সবগুলো আসরেই খেলেছে। ফুটবলের ইতিহাসে সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা, ছন্দ আর সাফল্যের প্রতীক হিসেবে যে দলটির নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়, সেটি ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছ থেকে সমর্থকরা সবসময়ই বাড়তি কিছু প্রত্যাশা করেন। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ব্রাজিলের পারফরম্যান্স হতাশ করেছে সমর্থক থেকে শুরু করে নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীদেরও। আর তাই হাইতির বিপক্ষে সামনে থাকা গ্রুপ ম্যাচটি তাদের জন্য কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। জয় ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। মূলত মরক্কোর সঙ্গে করা ড্র’ই তাদের এই সমীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আক্রমণাত্মক ফুটবল, দৃষ্টিনন্দন পাসিং এবং মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সামর্থ্য। কিন্তু এবার মাঠে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক ব্রাজিলকে। দলের খেলায় নেই সেই পরিচিত গতি, নেই আগ্রাসন কিংবা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার মানসিকতা। আক্রমণে উঠতে গিয়ে তারা বারবার ধীরগতির ফুটবলের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই নিজেদের রক্ষণভাগ গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

ব্রাজিলের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রমণভাগের কার্যকারিতা। গত ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গোল করে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন বটে। কিন্তু একটি দলের সাফল্য কখনোই একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ফরোয়ার্ডদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। গোল করার সুযোগ তৈরি এবং তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা দেখাতে হবে। কারণ বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সুযোগ নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে নেইমারের অনুপস্থিতি ব্রাজিলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে সে এই দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা। তার পায়ে বল থাকলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আলাদা এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। ইনজুরির কারণে এখনো পুরোপুরি ফিট না হওয়ায় তিনি মাঠে নামতে পারছেন না। ফলে দলের সৃজনশীলতার জায়গায় একটা বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সমর্থকদের মধ্যেও হতাশা কাজ করছে। কারণ নেইমারকে ঘিরেই অনেকের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।

তবে সব দোষ নেইমারের অনুপস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। মাঠে থাকা খেলোয়াড়দেরও নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিতে হবে। বিশেষ করে মাঝমাঠের ফুটবলারদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রমণ ও রক্ষণকে সংযুক্ত করার দায়িত্ব তাদেরই। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের মাঝমাঠ খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। বল দখলে রাখলেও তারা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার মতো কার্যকর পাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আধুনিক ফুটবলে গতি সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শীর্ষ দলগুলো এখন দ্রুতগতির পাসিং, ক্ষিপ্র মুভমেন্ট এবং মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণে ওঠার কৌশল ব্যবহার করছে। বল পায়ে রাখার চেয়ে বলকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া এবং ফাঁকা জায়গা তৈরি করাই এখন সাফল্যের চাবিকাঠি। এই জায়গাতেই পিছিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। তাদের আক্রমণ অনেক সময় পূর্বানুমেয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিপক্ষ সহজেই পরিকল্পনা সাজাতে পারছে।

তাই হাইতির বিপক্ষে সামনের ম্যাচে ব্রাজিলকে নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে। শুধু জয়ের জন্য নয়, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া পরিচয় ফিরে পাওয়ার জন্যও তাদের লড়তে হবে। মাঠে আত্মবিশ্বাস, গতি এবং সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এখনো ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। কারণ প্রতিভার অভাব এই দলে নেই। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন।

ব্রাজিলের সমর্থকরা এখনো বিশ্বাস করেন, তাদের দল যেকোনো মুহূর্তে জেগে উঠতে পারে। ইতিহাসও সেই বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু ইতিহাস দিয়ে বর্তমানের ম্যাচ জেতা যায় না। মাঠে প্রমাণ দিতে হয়। তাই এই ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে একটাই লক্ষ্য জয়। আর সেই জয়ের মধ্য দিয়েই হয়তো শুরু হতে পারে নতুন এক যাত্রা। অন্যথায় বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। এখন দেখার বিষয়, সেলেসাওরা চাপ সামলে নিজেদের চেনা রূপে ফিরতে পারে কি না।