ঋণখেলাপি ইস্যুতে বিতর্ক

জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপি ইস্যুতে বিতর্কে জড়িয়েছেন সংসদ সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, এই সংসদ ঋণখেলাপিদের। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। পাশাপাশি রুমিন ফারহানার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানানো হয়। অপরদিকে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ না করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে বিরোধী দল। পরে বক্তব্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

বাজেট আলোচনার এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে বাংলাদেশে টোটাল মন্দঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে যদি আপনি অবলোপন পুনঃতফসিল করা এবং মামলার কারণে যে ঋণের টাকা আটকে আছে আদালতে অর্থাৎ পেন্ডিং মামলা হিসেবে যেটা এখনো খাতায় তোলা হয়নি, সেটা যোগ করলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১১ লাখ কোটি টাকায়। যেটা মোট ঋণের ৫৯.৭৩ শতাংশ। সুতরাং ব্যাংকগুলো চাইলেও সরকারকে বেশি সহায়তা দিতে পারবে না।

ঋণখেলাপিদের নিয়ে এই বক্তব্য একপাঞ্জ করার দাবি জানান গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন। তিনি বলেন, আমরা অনেকেই জাতীয় সংসদে এমন কিছু কথা উচ্চারণ করি, যা আমাদের মর্যাদাকে খাটো করে। একজন সাংসদ বললেন, ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে, এই যে ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদ’ এই শব্দ কোথা থেকে পেলেন। আমি অনুরোধ করব আপনি এই শব্দটি এখান থেকে এক্সপাঞ্জ করবেন।

এরপর অধিবেশনে ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, সংসদে এতগুলো ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে। সংসদকে আমরা সার্বভৌম বলি। এখন এই সংসদে যদি আমরা ঋণখেলাপিদের ‘ঋণখেলাপি’ বলতে না পারি, তাহলে কোথায় বলব? আমার অনুরোধ থাকবে, এ ধরনের শব্দ এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার মতো কোনো বক্তব্য নয়।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদের সব সদস্যকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের উচিত। এখানে যারা আছেন, কেউ ঋণখেলাপি নন। নির্বাচনী আইন এবং অন্যান্য বিধিমালা অনুসারে, আদালত কর্তৃক কেউ ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হলে তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হন। তার নমিনেশন অবৈধ হয়ে যায়। যাদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের বা প্রাইভেট মামলা ছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট থেকে সেগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার পরই তারা বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে ‘ঋণগ্রস্ত’ হতে পারেন, কিন্তু ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে তাদের মানহানি করা হচ্ছে। এটি মানহানিকর বক্তব্য, এটি এক্সপাঞ্জ হওয়া উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) তথ্য উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, টিআইবি সম্প্রতি বলেছে, এই সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। আইনজীবী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু একজন আইনজীবী, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে রিশিডিউলিং করা হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সিআইবির (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে তা স্থগিত করে ইলেকশন করা হয় এবং এরপর আবারও সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও আমরা ভালো বুঝি।

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট একটি স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বাজেট, যা বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে।