আইসিইউ তালাবদ্ধ, জনবলের অপেক্ষায় ৫ বছর

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৩ জুন ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন মনোয়ারা বেগম। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালু না থাকায় দুই দিন পর স্বজনরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। শুধু মনোয়ারা বেগম নন, প্রতিদিনই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন দ্বীপ জেলা ভোলার গুরুতর অসুস্থ রোগীরা।

ভোলা জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় অনেক রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, অনেকে মারাও যাচ্ছেন। অথচ এই হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় পাঁচ বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে আধুনিক আইসিইউ ইউনিট। জনবল নিয়োগ না দেওয়ার কারণে চালু হচ্ছে না ইউনিটটি। এ অবস্থায় হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট কিংবা দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ছুটতে হয় বরিশাল কিংবা ঢাকায়।

স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ২২ লাখ মানুষের জেলা ভোলায় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও জনবল সংকটে সেবা আইসিইউ সেবা বন্ধ থাকাটা শুধু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাই নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

জানা গেছে, ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগার থেকে দুটি আইসিইউ বেড, পাঁচটি ভেন্টিলেটর, সাতটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু আইসিইউ ইউনিট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, ‘আইসিইউ বেড ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে। কিন্তু পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক, অ্যানেসথেটিস্ট, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন। এসব জনবলের জন্য একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল পাওয়া গেলে দ্রুত ইউনিট চালু করা সম্ভব হবে।’

সম্প্রতি সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউ ইউনিটের দরজা বন্ধ। ভেতরে থাকা বেড ও যন্ত্রপাতির ওপর জমেছে ধুলাবালি। নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি টাকার এসব আধুনিক সরঞ্জাম কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একজন রোগীর স্বজন মো. আরিফ বলেন, ‘গত বছরের শেষ দিকে এক আত্মীয় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রাতের বেলা হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসকরা আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কিন্তু এখানে সে ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বরিশালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পথে রোগীর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো।’

হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. কায়ছার আলম বলেন, ‘প্রতিদিনই এমন রোগী আসে যাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইউনিট চালু না থাকায় আমরা তাদের অন্যত্র রেফার করতে বাধ্য হই। আইসিইউ চালু হলে জেলার মানুষ অনেক উপকৃত হবে।’

ভোলা জেলা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি ডা. শরীফ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ভবিষ্যতে এখানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হাসপাতালটির অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় আইসিইউ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ভোলাও এ কার্যক্রমের আওতায় আসবে বলে আমরা আশাবাদী। আইসিইউ চালুর ব্যাপারে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

ভোলা জেলা ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ভোলা দ্বীপ জেলা হওয়ায় সন্ধ্যার পর বা জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুতর রোগীদের দ্রুত অন্য জেলায় স্থানান্তর করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এখানকার মানুষের জন্য কার্ডিওলজি ও আইসিইউ সেবা অত্যন্ত জরুরি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত