ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরে দানা বেঁধেছে শক্তিশালী ‘এল নিনো’। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া ও তাপমাত্রার খামখেয়ালিপনার কথা আগেই জানিয়েছিলেন আবহাওয়াবিদেরা। এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে এবার বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ খরা, বন্যা ও প্রলয়ংকরী তাপপ্রবাহের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এতে চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা। তবে এবার এল নিনো আঘাত হানার পর ত্রাণের জন্য অপেক্ষা না করে, আগেই ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ।
এল নিনোর ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে বিশ্বের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি দেশের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০ কোটি ২০ লাখ (২০২ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের জরুরি তহবিল চেয়েছে সংস্থাটি।
আসন্ন বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) প্রথমবারের মতো যৌথভাবে একটি ‘আগাম প্রস্তুতিমূলক আবেদন’ বা ‘জয়েন্ট অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন অ্যাপিল’ চালু করেছে।
এ বিষয়ে এফএওর উপমহাপরিচালক বেথ বেচডল বলেন, ‘আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে-সংকট চরম আকার ধারণ করার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগাম পদক্ষেপ অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। এল নিনোর ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রযুক্তি আমাদের হাতে রয়েছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিপর্যয় শুরুর আগেই যেন অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায়।’
সংস্থা দুটির হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগ আঘাত হানার পর ক্ষতিপূরণের চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়াটা অনেক বেশি লাভজনক। হিসাব বলছে, আগাম প্রস্তুতির জন্য ১ ডলার বিনিয়োগ করা হলে, তা দুর্যোগ-পরবর্তী অন্তত ৭ ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি ও ত্রাণের খরচ বাঁচাতে পারে।
এই ২০২ মিলিয়ন ডলার তহবিলের মাধ্যমে আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক এবং লাতিন আমেরিকার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই কৃষকদের সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগের মধ্যে খরা ও বন্যা-সহনশীল বীজ ও নগদ অর্থ বিতরণ, গবাদিপশু রক্ষার ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো তৈরি এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া অন্যতম।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো তৈরি না করলেও, এটি এর প্রভাবকে আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তোলে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ফসলহানি ও পানির তীব্র সংকটের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে।
ডব্লিউএফপির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ পরিস্থিতিকে একটি ‘সংকীর্ণ জানালা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এল নিনো আমাদের দোরগোড়ায়। আরেকটি ভয়াবহ বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের পরিণতি ভোগ করার সামর্থ্য এই বিশ্বের নেই। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমাদের হাতে খুব সামান্যই সময় রয়েছে।’
কৃষিব্যবস্থায় এল নিনোর এই ধাক্কা সামলাতে এখন টেকসই পদ্ধতির দিকেও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এই সংকট থেকে উত্তরণের দীর্ঘমেয়াদি পথ খুঁজতে আগামী ২৩ জুন ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার ফোরাম-২০২৬’। সেখানে বৈশ্বিক কৃষিব্যবস্থাকে কীভাবে দুর্যোগ সহনশীল ও টেকসই করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বিশ্বনেতা ও বিশেষজ্ঞরা।