যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ অবসানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে নিজ দেশের সমালোচকদের ওপর চড়াও হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ইরান এখন ‘শেষ’ হয়ে গেছে। শুক্রবার (১৯ জুন) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ধারাবাহিক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তিনি ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ বন্ধে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির পক্ষে শুক্রবার নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। এর মাত্র একদিন আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে পূর্বনির্ধারিত সফর বাতিল করেন। সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভ্যান্সের এই সফর বাতিলের ফলে চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে এই কূটনৈতিক সাফল্য ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে ডেমোক্র্যাট এবং একদল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার কঠোর সমালোচনা করেন। সমালোচকরা দাবি করছেন, এই সমঝোতা স্মারকটি কেবল সেই সমস্যাগুলোই সমাধানের চেষ্টা করছে, যা যুদ্ধের ফলে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের বন্দরে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে লড়াই বন্ধ করা।
সমালোচকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘এই যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করে দিয়েছে!’ তিনি দাবি করেন, মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং প্রথাগত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা বলছে চার মাস আগের চেয়ে ইরান এখন ভালো অবস্থায় আছে। ভাবা যায়, এমন মিথ্যা বলে পার পেয়ে যাচ্ছে? মানুষ কতটা বোকা হতে পারে?’
আরেকটি পোস্টে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং ‘হতাশা’ থেকেই ইরান আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, ‘তারা এখন শেষ!’
চুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ৬০ দিনের সময়সীমা মেনে চলব।’ উল্লেখ্য, এই ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্তকরণ, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক্সিওস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরানের এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সম্ভবত তাদের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’। তিনি আরও যোগ করেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণহীন এই যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি শিখেছেন যে, তার ক্ষমতার ‘কোনো সীমা নেই’।
চুক্তির সমালোচনা করায় নিজ দলের ‘ইরান বিরোধী’ কঠোরপন্থী নেতাদেরও ছাড় দেননি ট্রাম্প। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর টম কটন ইরানের জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের ওপর থেকে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সমালোচনা করে একে ‘ভুল পথে পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া সিনেটর রজার উইকার ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এবং লেবাননে লড়াই বন্ধের প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেছেন। তবে ট্রাম্পের দাবি, এই তহবিল মার্কিন করদাতাদের অর্থে পূরণ করা হবে না।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পুনরায় অভিযোগ করেন, লেবাননে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। একই দিনে ইসরায়েল দাবি করেছে, মধ্যরাতের পর থেকে তারা দেড় শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে এরপরই রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মার্কিন কর্মকর্তা, দুই হিজবুল্লাহ সূত্র এবং এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, লেবাননে নতুন করে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের ওপর যেন আক্রমণ না করা হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ভালো, তবে তাকে কিছুটা বিচক্ষণ থাকতে হবে।’
সূত্র: আল-জাজিরা