যেসব দোষত্রুটি প্রকাশ গিবত নয়

ইসলামের কোনো বিধানই প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সাধারণভাবে মিথ্যা বলা হারাম। কিন্তু কারও জীবন রক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে ব্যতিক্রমও হয়। তেমনি গিবত হারাম। আবার ইসলাম এমন কিছু পরিস্থিতির স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে কারও দোষত্রুটি উল্লেখ করা শুধু বৈধই নয়, কখনো কখনো প্রয়োজনীয়ও। কারণ ইসলামের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তির সম্মান রক্ষা নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সমাজকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং সত্যকে সংরক্ষণ করা।

বর্তমান সময়ে এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ আমরা একদিকে এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত ভুল নিয়ে প্রকাশ্য চর্চা ও চরিত্র হননকে বিনোদনে পরিণত করা হয়েছে। অন্যদিকে এমন অনেক মানুষও আছেন, যারা যেকোনো সমালোচনাকেই গিবত বলে আখ্যা দিয়ে নিজেদের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখতে চান। ফলে গিবতের প্রকৃত সীমারেখা বোঝা জরুরি।

ইসলাম প্রথমেই অত্যাচারিত মানুষের কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে যার প্রতি অত্যাচার করা হয়, তার কথা স্বতন্ত্র।’ (সুরা নিসা ১৪৮) একজন মজলুম যদি তার ওপর সংঘটিত জুলুমের কথা প্রকাশ করতে না পারেন, তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথই বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হকদারের জন্য কথা বলার অধিকার আছে।’ (সহিহ বুখারি) একজন কর্মচারী তার নিয়োগকর্তার অন্যায় আচরণের অভিযোগ করবেন, একজন মজলুম তার নির্যাতনের কথা আদালতে বলবেন, এসব গিবত নয়, বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার বৈধ প্রচেষ্টা।

একজন মানুষ যদি গোপনে কোনো গুনাহ করে এবং সে তার জন্য লজ্জিত থাকে, তাহলে তার সেই পাপ মানুষের সামনে তুলে ধরা হারাম। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নিজেই তার পাপকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে, সেটিকে স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্যদের সেই পথে উৎসাহিত করে কিংবা সমাজে তার মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তখন বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না, বরং সামাজিক হয়ে যায়।

ইসলাম কাউকে অপমান করার জন্য তার দোষ বলার অনুমতি দেয়নি, বরং মানুষকে তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়ায়, প্রতারণা করে বা অন্য কোনো পাপকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে, তাহলে তার সেই প্রকাশ্য কাজের সমালোচনা করা গিবত নয়, বরং সমাজকে সতর্ক করার দায়িত্ব।

একইভাবে মানুষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির ত্রুটি উল্লেখ করাও বৈধ। বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি গোপন করা ইসলামের শিক্ষা নয়। ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা.)-কে বিয়ে করার জন্য দুজন প্রস্তাব দেন। তিনি এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, একজন প্রস্তাবদাতা স্ত্রীকে প্রহার করার স্বভাবের অধিকারী এবং অন্যজন আর্থিকভাবে অসচ্ছল। (সুনানে নাসায়ি) নবীজি (সা.) এটিকে গিবত হিসেবে দেখেননি, বরং প্রয়োজনীয় নসিহত হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান  কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।’ (সুরা হুজুরাত ১২)

কোরআনের এই আয়াতের মাধ্যমে গিবতের ভয়াবহতা এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। গিবত সামাজিক অপরাধ এবং এটি এমন এক নৈতিক অবক্ষয়, যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তাই আমরা গিবত থেকে বিরত থাকব। তবে যেসব ক্ষেত্রে কারও দোষত্রুটির কথা না জানালে মানুষ ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে সেসব ক্ষেত্রে তা প্রকাশ করা বৈধ হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়