এই পৃথিবীর সেরা বাবা আছে আমার ঘরে

আমার শৈশবের সবচেয়ে বিস্ময়কর ক্লাসরুম ছিল রেলস্টেশন। আর সেই ক্লাসরুমের শিক্ষক ছিলেন আমার আব্বা!

আব্বা ছিলেন স্টেশন মাস্টার। সেই সুবাদে রেলকলোনিতে থাকতাম। তখন আব্বা দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশনে ছিলেন। আব্বার হাত ধরেই রেললাইন, রেলগাড়ি, কয়লার ইঞ্জিন, ডিজেল ইঞ্জিন চিনেছি। আব্বা সিগন্যালের ভাষা বুঝিয়েছেন। সবুজ বাতি লাল বাতির মর্ম বুঝিয়েছেন। আখের গাড়ি কীভাবে তখনকার জিলবাংলা সুগার মিলে ঢুকে যায় চিনি বানাবে বলে, আব্বাই আমাকে দেখিয়েছেন। ট্রেন কীভাবে লাইন ক্লিয়ার নেয় তা দেখিয়েছেন।

একদিন সমান্তরাল রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে আব্বা বলেছিলেন, এর ওপর দিয়ে ট্রেন যায়। ট্রেনে চড়ে মানুষ যায়। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। তখন কথার গভীরতা বুঝিনি। শুধু ট্রেনের শব্দে হুইসেলের ডাকে আর ছুটে চলা বগিগুলো দেখেছি মুগ্ধ হয়ে।

আজ বড় হয়ে বুঝি, আব্বা শুধু আমাকে রেলের সবকিছু চিনিয়ে দেননি; তিনি জীবন কর্মের স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন। আমার বড়বেলায় একদিন আব্বা ট্রেনের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ট্রেন যেমন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পথ হারায় না, তেমনি মানুষকেও লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে হয়। এখনো ট্রেনের শব্দ, রেললাইন, স্টেশন, সিগন্যাল, স্টেশনের ঘণ্টা সবকিছু যেন আব্বার স্মৃতি বহন করে।

খুব মনে পড়ে তখন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ি। ফাইভ কি সিক্স ক্লাসে। আব্বা পোস্ট অফিসে নিয়ে গিয়ে আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মানিঅর্ডার করতে হয়, রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠাতে হয়, টেলিগ্রাম কীভাবে করতে হয়। সময়ের সঙ্গে মানিঅর্ডার হারিয়েছে, চিঠির জায়গায় নিয়েছে মোবাইল ফোনের ক্ষুদেবার্তা। কিন্তু আব্বার শেখানো সেই নিয়মগুলোর কথা হারায়নি। এখনো কোনো ফরম পূরণ করতে গেলে মনে হয় আব্বার সেই কথা ফরমফিলাপ করতে হয় দেখে শুনে-বুঝে। ভুল করিস না। ফরমে কাটাকাটি ভালো না।

আব্বা একটা কথা প্রায়ই বলতেন মানুষ বড় হয় তার চরিত্রে, তার আচরণে। বয়সে যতই বড় হচ্ছি ততই আব্বার এই কথার মর্মাথ গভীরভাবে বুঝতে পারছি। সততা, পরিশ্রম, সময়ের মূল্য আর মানুষের প্রতি সম্মান আব্বাকে দেখে দেখে শিখেছি। চার ভাই চার বোনের মধ্যে সবার ছোট হিসেবে আব্বার কাছ থেকে পেয়েছি বেশিমাত্রায় আদর-প্রশ্রয়।

আব্বার স্নেহ-আদর-ভালোবাসা হৃদয়ে অনুভব করতে হয়। পৃথিবীতে সবার আব্বাই একই মাত্রায় স্নেহ-আদর সন্তানদের দিয়ে থাকেন। তিনি শুধু একজন মানুষ নন, তিনি ছায়াঘেরা বৃক্ষ যার নিচে দাঁড়িয়ে সন্তান নিরাপত্তা খুঁজে পায়। তিনি পাশে থাকা মানে কোনো ভয় নেই।

পৃথিবী জুড়ে সর্বস্তরের সন্তানদের কাছে একটাই অনুভূতি বাবা আমার কত্তো ভালো, কত্তো আদর করে, এই পৃথিবীর সেরা বাবা আছে আমার ঘরে।