আমার আব্বা

আমার জন্মদাতাকে ‘বাবা’ না বলে বলতাম ‘আব্বা’। আমার সেই আব্বা ছিলেন একজন রেল কর্মচারী। মোটামুটি ভালো পদেই চাকরি করতেন। মা ছিলেন একান্তভাবেই ‘গৃহিণী’ বলতে যা বোঝায় তাই। সব ব্যাপারে তিনি আমাদের শাসন-বারণ করলেও আব্বা ছিলেন এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব-নিরীহের ভূমিকায়। বরং আমাদের ভাই-বোনদের মা যখন চড়-থাপ্পড় মারতেন, আব্বা সামনে থাকলে তাকে রীতিমতো বাধা দিতেন। মাকে বলতেন, ‘তুমি মা না হয়ে ওদের বাবা হলে ভালো হতো। সবসময় শুধু শাসন আর শাসন।’

মা কিছুক্ষণের জন্য হলেও নীরব হয়ে যেতেন।

সত্যি বলতে কী, আব্বা আমাদের ভাই-বোনদের গায়ে কোনো দিন হাত তোলেননি। অফিস থেকে বাসায় যখনই ফিরতেন, আমাদের জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসতেন। নানা ধরনের ফলমূল। চানাচুর বা বিস্কুট। সবচেয়ে বেশি আনতেন ফলের মৌসুমে তরমুজ এবং আনারস। আম তো ছিলই। তার অর্থ এই নয় যে, মা নিষ্ঠুর গোছের কেউ ছিলেন। মা আমাদের শাসন করতেন বেহিসেবি দুষ্টামি করলে।

আজ আমি যে সাহিত্যকর্ম করি, নানা ধরনের বইপত্র পড়ি, এর মূলে ছিলেন আমার আব্বা। আমার যখন সাড়ে তিন কী চার বছর বয়স, তখন থেকেই আমার জন্য প্রাইভেট শিক্ষক রাখা হয়। তিনি মোট আড়াই বছর আমাকে পড়িয়েছিলেন এবং এ কথা আমাকে স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তিগত ওই শিক্ষকের পড়ানোর ফলে আমি সাত বছর বয়সে পা দেওয়ার আগেই পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই, যাকে বলা হতো তখন ‘আউটবই’, পড়ার মতো যোগ্যতা বা ক্ষমতা অর্জন করে ফেলি। আমার জীবনের প্রথম ‘আউট বই’ ছিল ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’। ‘দেব সাহিত্য কুটির’ থেকে প্রকাশিত বইটি এতটাই সহজ-সরল ভাষায় লেখা ছিল যে, আমার পড়তে ও বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি। বইটা পড়ে আমার মন এতটাই আলোকিত হয়েছিল যে, আমার পরিচিত তরুণ পাঠকদের এখনো বইটা পড়ার অনুরোধ জানাই। এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমার জীবনের প্রথম আউট বইটা উপহার দিয়েছিলেন আমার আব্বা। আব্বা আমাকে দুটি বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে গেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আর সেটা হলো বই পড়া আর খেলাধুলা করা। ক্লাসের পড়ায় যাতে অবহেলা না করি, সে ব্যাপারেও আব্বার তাগিদ কম ছিল না।

আব্বার উপহার দেওয়া বই কি শুধু ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’? সারা জীবন কত যে বই ছোটদের, এমন কি বড়দেরও, আমাকে উপহার দিয়েছেন, তার শেষ নেই। আব্বা নিজে যেমন বই পড়তেন, তেমনি আমাকে শুধু নয়, মাকেও বই এনে পড়তে দিতেন। মার প্রিয় লেখক ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

আব্বার চাকরির সুবাদে আমরা যেখানে যেতাম, সেখানেই রেলওয়ে বুক স্টল এবং রেল ইনস্টিটিউট থেকে আব্বা বই সংগ্রহ করতেন এবং কিনতেন। ফলে আমাদের বাসায় গড়ে উঠেছিল ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি। আর সেই লাইব্রেরি থেকে যেমন আমার পাড়ার বন্ধুরা, তেমনি আব্বার সহকর্মীরাও বই বেছে নিয়ে গিয়ে পড়তেন। পড়া শেষে তারা ফেরত দিতেন। আবার নিতেন।

আমার আব্বা সত্যিই আলোকিত একজন মানুষ ছিলেন। অন্যদেরও আলোকিত করার ব্যাপারে তার ইচ্ছা ছিল অদম্য। আমার আব্বা প্রতিপদে আমাকে এখনো আলোকিত করে চলেছেন। মনে হয়, আমাকে পথ দেখাতে আমার আগে আগে হাঁটছেন তিনি।