৭০ বছর বয়সে ইয়েমেনি নারীর হাফেজ হওয়ার কৃতিত্ব

মরিয়ম আল-রুমাইমা। বয়স ৮০। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের বাসিন্দা। বয়োবৃদ্ধ এই নারীকে নিয়ে বিস্ময়ের শেষ নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি অর্জন করেছেন এমন এক সৌভাগ্য, যা অনেক মানুষ যৌবনেও পারেন না। ৬০ বছর বয়সে তিনি কোরআন মুখস্থ শুরু করেন। ছিলেন নিরক্ষর, শেখার সামর্থ্যও ছিল না। তবু কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অবিচল ধৈর্য এবং ১০ বছরের নিরলস সাধনায় তিনি মুখস্থ করেন সম্পূর্ণ কোরআন। এটি গভীর অধ্যবসায় এবং অদম্য মানসিক শক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইন্টারন্যাশনাল কোরআন নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইজ প্রদেশের সাবর পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত হাদনান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মরিয়ম। শৈশবে শিক্ষার সুযোগ পাননি। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে ব্যয় করেছেন। তবে তার হৃদয়ে সবসময় একটি স্বপ্ন লালিত হতো, কোরআন মুখস্থ করার স্বপ্ন।

এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে যখন তার একমাত্র ছেলে শায়খ মুখতার গ্রামে একটি হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালে ষাট বছর বয়স পার হওয়ার পর মরিয়ম কোরআন হিফজের যাত্রা শুরু করেন। তার ছেলে জানান, কোরআনের প্রতি তার মায়ের ভালোবাসা ছিল বহু দিনের। তিনি সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন কোরআন মুখস্থ করার আগে তার মৃত্যু না হয়।

নিরক্ষর হওয়ায় তিনি কোরআন দেখে পড়ে শিখতে পারেননি। গ্রামের একজন শিক্ষকের সহায়তায় শ্রবণের মাধ্যমে মুখস্থ করা শুরু করেন। শিক্ষক তাকে আয়াত শুনিয়ে দিতেন এবং প্রতিদিনের পাঠ নির্ধারণ করে দিতেন। আসরের পর তিনি পাঠ গ্রহণ করতেন, আর মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময় ব্যয় করতেন মুখস্থ অংশ মজবুত করতে।

এই দীর্ঘ যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিল একটি টেপ রেকর্ডার ও কয়েকটি ক্যাসেট। তিনি বিখ্যাত কারি শায়খ ফারিস এবাদের তেলাওয়াত শুনে আয়াতগুলো মুখস্থ করতেন। একটি ক্যাসেট শেষ হলে সন্তানরা দ্রুত পরবর্তী ক্যাসেট প্রস্তুত করে দিত। ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ আদায়ের পাশাপাশি তিনি কোরআন শুনতেন এবং পুনরাবৃত্তি করতেন। এই যাত্রাটি সহজ ছিল না। একই ধরনের আয়াত ও কাছাকাছি শব্দের আয়াতগুলো মনে রাখা তার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সুরা তওবা ও সুরা রাদ মুখস্থ করতে গিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্টের মুখোমুখি হন। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি।

টানা দশ বছর সাধনার পর ২০১৬ সালে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ সম্পন্ন করেন। শেষ আয়াত মুখস্থ তেলাওয়াত করার পর আনন্দে তার চোখে অশ্রু নেমে আসে। তিনি দীর্ঘ সময় সেজদায় লুটিয়ে থেকে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। মরিয়মের ২১ সন্তান ও নাতি-নাতনির অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। তবু তাদের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও গর্বের বিষয় হয়ে ওঠেন নিরক্ষর এই দাদি। তিনি কেবল পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাজবিদ ও শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি যতœশীল এই নারী বিশেষভাবে ভালোবাসেন সুরা বাকারাকে।