মানুষের জীবনে নেতৃত্বের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্রের নীতি, প্রশাসনের চরিত্র এবং ক্ষমতার ব্যবহারের ধরন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যখন নেতৃত্ব ন্যায়, সততা ও আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও কল্যাণের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর যখন নেতৃত্ব জুলুম, স্বার্থপরতা ও দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। তাই এক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয়দের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কারে নির্মোহ ও স্বাধীন আলেমদের কিছু দায়িত্ব পালন করা জরুরি।
ইতিপূর্বে জুলুম, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, চাঁদাবাজি, অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটেছে। এসব প্রবণতা কেবল রাষ্ট্রীয় সংকট সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ইমান, নৈতিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে উম্মাহর প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, সংগঠিত, দূরদর্শী এবং স্বাধীন হকপন্থী ওলামায়ে কেরামের দল। এমন ওলামায়ে কেরাম, যারা ক্ষমতাবানদের দরবারে অবস্থান করে চাটুকারিতা করবেন না, পদ-পদবি, অর্থ, সুবিধা কিংবা হালুয়া-রুটির লোভে সত্য গোপন করবেন না, কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রে পরিণত হবেন না, ব্যক্তিগত স্বার্থে নীতি বিক্রি করবেন না এবং ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলামের নির্দেশনা বিকৃত করবেন না।
তাদের দায়িত্ব হবে রাজনীতিবিদদের প্রকৃত কল্যাণকামী হওয়া। তারা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন দাওয়াত, ইসলাহ, তাজকিয়া ও নসিহতের উদ্দেশ্যে। তারা ক্ষমতাবানদের স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পদমর্যাদা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর আদালতের জবাবদিহি অবশ্যম্ভাবী। তারা তাদের অন্তরে আল্লাহভীতি, আখেরাতের চিন্তা, ইনসাফ, আমানতদারিতা, মানবসেবা এবং জনগণের হক আদায়ের অনুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা করবেন।
এই দাওয়াত ও সংস্কার কার্যক্রম কেবল মসজিদ, মাদ্রাসা বা ব্যক্তিগত মজলিসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আধুনিক যুগের সব বৈধ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে পরিচালিত হবে। সরাসরি সাক্ষাৎ, নসিহতের বৈঠক, প্রশিক্ষণ, ইসলাহি মজলিস, সেমিনার ও সম্মেলনের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনফারেন্স, পডকাস্ট, ডিজিটাল লাইব্রেরি, অনলাইন কোর্স, গবেষণা কেন্দ্র এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দাওয়াতি উদ্যোগের মাধ্যমেও নেতৃত্ব শ্রেণির কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
কারণ সমাজের সাধারণ মানুষের সংস্কার যেমন প্রয়োজন, তেমনি নেতৃত্বশ্রেণির সংস্কার আরও বেশি প্রয়োজন। একজন সাধারণ মানুষের সংশোধনে একটি পরিবার উপকৃত হতে পারে। কিন্তু একজন প্রভাবশালী নেতার সংশোধনে হাজারো, কখনো লাখো মানুষ উপকৃত হতে পারে।
অতএব, বর্তমান যুগের অন্যতম বড় দাওয়াতি প্রয়োজন হলোÑ এমন একদল নির্ভীক, স্বাধীন ও মুখলিস ওলামায়ে কেরামের উত্থান, যারা ক্ষমতার দরবারের চাকর নয়, বরং নবীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে সত্যের পতাকা বহন করবেন। তারা রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কিছু নিতে যাবেন না, বরং তাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনতে, তাদের ইমান ও নৈতিকতার হেফাজত করতে এবং জাতিকে ন্যায়, সত্য, ইনসাফ ও তাকওয়ার পথে পরিচালিত করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবেন।
যেদিন নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ক্ষমতার অহংকারের পরিবর্তে আল্লাহভীতি, স্বার্থপরতার পরিবর্তে আমানতদারিতা, মিথ্যার পরিবর্তে সত্য এবং জুলুমের পরিবর্তে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিনই একটি কল্যাণময়, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চিন্তা, চরিত্র ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের মাধ্যমেও গড়ে ওঠে। এ কাজের জন্য প্রয়োজন এমন আলেম সমাজ, যারা সত্যের প্রশ্নে আপসহীন, নসিহতের ক্ষেত্রে নির্ভীক এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে আন্তরিক।
লেখক : ইসলামি গবেষক