বিএনপি-জামায়াতের স্লিপ ছাড়া ধান বিক্রি হয় না

মেহেরপুরে চলতি মৌসুমে সরকারি দরে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ অভিযানে দলবাজির অভিযোগ উঠেছে। ধান বিক্রিতে বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে সিøপ সংগ্রহের শর্ত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রান্তিক চাষিরা সরকারি গুদামে গিয়ে সহজেই সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। এতে বিপাকে পড়েছেন বড় অংশের চাষি। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি এই ব্যাপারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

সরকারি গুদাম এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে চাষিদের কোনো ভিড় নেই। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে কিছু চাষি ধান নিয়ে গেছে। তাদের হাতে আছে স্লিপ। জানা গেল, স্লিপ ছাড়া গুদামে ধান বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এমন নির্দেশনা গুদাম কর্তৃপক্ষের। এর বাইরে ট্রাকবোঝাই হয়ে ধান ঢুকছে ব্যবসায়ীদের। তারা কৃষকদের কাছ থেকে স্বল্প দামে ধান কিনে সেই ধান ট্রাকবোঝাই করে সরকারি দরে বিক্রি করছেন গুদামে। এদের সঙ্গে গুদাম কর্তৃপক্ষের রয়েছে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। মেহেরপুরে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সিন্ডিকেট।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মেহেরপুর বিএনপি এখন দুই গ্রুপে বিভক্ত। দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে গত নির্বাচনে মেহেরপুরের দুটি আসনে এই প্রথম জামায়াত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। মূলত এ কারণে রাজনৈতিক অস্তিত্ব দুই দলের থাকলেও যেকোনো ক্ষেত্রে ভাগ দিতে হয় তিন গ্রুপকে। মেহেরপুরে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযানে রাজনৈতিক সমঝোতা মতে বিএনপির দুই গ্রুপ নেবে ৬০ শতাংশ এবং জামায়াতকে দিতে হবে ৪০ শতাংশ স্লিপ। এই ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে পছন্দের চাষিরা স্লিপ পাবেন এবং তারাই খাদ্যগুদামে সরকারি দরে ধান বিক্রির সুবিধা পাবেন। সাধারণ কৃষকের কাছে সিøপপ্রাপ্তরা এখন ‘সরকারি চাষি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন, ‘শুধু স্লিপপ্রাপ্তরাই সুবিধা পাবেন। আমরা পাব না!’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর সদর উপজেলায় কৃষকদের কাছে থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ৭৩০ টন ধান সংগ্রহ করা হবে। গত ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। ৪ জুন পর্যন্ত শহরের এই খাদ্যগুদামে ১৪৪ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।

মেহেরপুর পৌর এলাকার কালাচাঁদপুর গ্রামের ১৭ জন চাষি গত বৃহস্পতিবার ধান দিতে সরকারি গুদামে গেলে তাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্লিপ নিয়ে আসতে বলেন মেহেরপুর সদর উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) মাসুদ রানা। কালাচাঁদপুর গ্রামের কৃষক শান্ত আলী জানান, ‘৩৬ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করার জন্য আমরা এলাকার কয়েকজন চাষি খাদ্যগুদামে আবেদন করেছিলাম এবং কৃষি অফিসারের কাছ থেকে ধানের গুণগত মান সম্পর্কে প্রত্যয়ন নিয়েছি। তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারিনি। ওসি এলএসডি মাসুদ রানা বলেছেন, আগে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্লিপ নিয়ে আসতে।’

শান্ত আলী বলেন, ‘আমি ৪ বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছি। সংসারে নিজের চাহিদা মিটিয়ে আরও ৪ টন ধান বিক্রি করতে পারব। কিন্তু ধান বিক্রিতে এমন দুর্নীতি অনিয়ম চললে আমার মতো শত শত প্রান্তিক চাষি সরকারি সুফল পাবে না। সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে এই প্রথা অবিলম্বে ভাঙা উচিত।’

আবার কালাচাঁদপুরের স্লিপপ্রাপ্ত চাষি মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি বিএনপি জেলা সেক্রেটারি কামরুল হাসানের স্লিপ সংগ্রহ করার কারণেই ৩ টন ধান সরকারি মূল্যে বিক্রি করতে পেরেছেন।

এ বিষয়ে মেহেরপুর সদর ভারপ্রাপ্ত খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা কৃষকদের কাছে থেকেও ধান ক্রয়-সংগ্রহ করছি।’ অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি হুকুমের গোলাম। এর বেশি কী করার আছে আমার?’ খাদ্যগুদামের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির মিটিংয়েই মূলত বিএনপির দুই গ্রুপ ও জামায়াতের সমন্বয়ে স্লিপ বণ্টন সাপেক্ষে ধান সংগ্রহের এই ফর্মুলা তৈরি করা হয়। এখন সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজনৈতিক নেতারা পছন্দের কৃষকদের স্লিপ দিচ্ছেন।

সদর উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এরশাদ আলী বলেন, ‘শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক নেতাদের কিছু দিয়ে বাকি প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে প্রান্তিক চাষিরা প্রত্যয়নসহ গুদামে গেলে অবশ্যই তাদের ধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে। ফলে রাজনৈতিক স্লিপ ছাড়া ধান নেওয়া হবে না এমন অভিযোগ সত্য নয়।’

মেহেরপুর সদর উপজেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবলু সূত্রধর বলেন, ‘প্রান্তিক চাষিরা যাতে ধান দিতে পারেন সে লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। যেসব চাষি ধান দিতে পারছেন না, তারা অভিযোগ করলে প্রশাসন তাদের ধান দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।’ তবে রাজনৈতিক নেতাদের স্লিপের বিষয়টির কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান তিনি।