হরমুজ প্রণালির মাঝামাঝি অংশে প্রায় ৮০টি বিস্ফোরক মাইন ছড়িয়ে রয়েছে, যার ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল এখনো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ট্যাংকার মালিকদের সংগঠন ইন্টারট্যাংকোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক মাইন অপসারণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) থেকে কিছু জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাইন, নৌ-নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপ অব্যাহত থাকবে।
ইন্টারট্যাংকোর মেরিন ডিরেক্টর ফিল বেলচার বলেন, হরমুজ প্রণালির মাঝখানের মূল নৌপথ বর্তমানে কার্যত বন্ধ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান, 'সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৮০টি মাইন রয়েছে। এটি বিশাল সংখ্যা এবং সেগুলো পরিষ্কার করতে সময় লাগবে।'
সংঘাত চলাকালে ইরান প্রণালির কেন্দ্রীয় নৌপথে এসব মাইন পেতে রাখে, যাতে ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সীমিত করা যায়। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক দুই পাশে আটকা পড়েন। যদিও কিছু জাহাজ মার্কিন সহায়তায় রাতে ওমান উপকূল ঘেঁষে গোপনে চলাচল করেছে। আবার কিছু জাহাজ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করে ইরানি জলসীমা ব্যবহার করেছে, যাকে অনেকে "তেহরানের টোলবুথ" বলে অভিহিত করছেন।
সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করত এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। এখন জাহাজগুলোকে বিকল্প ও সংকীর্ণ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
বেলচার পরিস্থিতিকে একটি মহাসড়কের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, "মহাসড়কের মাঝের লেন বন্ধ থাকলে যেমন গাড়িগুলোকে পাশের সরু অংশ দিয়ে চলতে হয়, এখানেও ঠিক তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।"
এদিকে জাহাজ চলাচলে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো নেভিগেশন ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক বিঘ্ন বা ‘সিগন্যাল জ্যামিং’। অভিযোগ রয়েছে, সংঘাতের সময় ইরান এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যার কারণে অনেক জাহাজের অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ বা জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
বিশ্বের অন্যতম সামুদ্রিক তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মীড বলেন, পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। তার মতে, "চলতি বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনে হয় না।"
বর্তমানে প্রায় ৬০০ জাহাজ পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ রয়েছে, যেগুলোর অনেকই ফেব্রুয়ারি থেকে নোঙর করে আছে। ফলে তৈরি হওয়া জট কাটাতেও সময় লাগবে।