শর্ষের ভেতর ভূত তাড়াবে কে

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ‘সুশাসন’। একটি রাষ্ট্রকে ‘সভ্য’ বলার কষ্টিপাথর সুশাসন। অথচ আজ যখন আমরা চারপাশের চেনা আঙিনায় চোখ রাখি, তখন সুশাসনের সেই কাক্সিক্ষত রূপ যেন মরীচিকা বলে ভ্রম হয়। যে শাসনব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল নাগরিকের জন্য বর্ম, তা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ভূত তাড়ানোর জন্য যে ওঝা সর্ষে ছিটাবেন, সেই সর্ষে দানায় যদি অশুভের বাস থাকে, তবে মন্ত্রের সাধনা শুরুতে ব্যর্থ। সমাজ ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই ‘ভেতরের ভূত’ জেঁকে বসেছে। যে হাতগুলোর দায়িত্ব ছিল ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা সোজা রাখা, আজ সেই হাতগুলো কখনো লিপ্ত হচ্ছে দুর্নীতির চোরাবালিতে। যে কারণে টেবিলের ওপর রাখা নিয়মের ফাইলগুলোয় ধুলো জমে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে যে হতাশা আর আশার দোলাচলের কথা বলেছেন, আজ সুশাসনের অভাবে আমরা সেই দোলাচলে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগের চাবুক কেবল দুর্বলের পিঠে পড়ে; সবলের সামনে মায়াবী জাদুদণ্ডের মতো অদৃশ্য।  বৈষম্যের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা আজ ক্লান্ত, বিদীর্ণ। যখন রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যখন শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি শৃঙ্খলাভঙ্গের উৎস হয়ে ওঠেন, তখন সেই সমাজকে ভেতর থেকে ঘুণপোকা খেতে শুরু করে। তবে এই জীর্ণতা, অন্ধকারের ভূত একদিনে জন্ম নেয়নি। লোভের চারাগাছটিকে যখন প্রশ্রয়ের জল-হাওয়া দেওয়া হয়, তখনই তা মহিরুহ হয়ে সুশাসনের আকাশকে ঢেকে ফেলে। যতক্ষণ না আমরা ভেতরের ক্ষত স্বীকার করছি, যতক্ষণ না শুদ্ধি অভিযান নিজের ঘর থেকে শুরু হচ্ছে, ততক্ষণ সুশাসনের সূর্যোদয় অসম্ভব। যে মানুষ সাহসের সঙ্গে শর্ষের খোলস বদলে, সমাজে স্নিগ্ধ আলো আনবে। প্রথমেই তাকাতে হবে ক্ষমতার সেই অলিন্দে, যেখানে নীতিনির্ধারণের চাবি রক্ষিত। ক্ষমতার অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে। জাঁ-জাক রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়েই জন্মায়, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।’ আমাদের সুশাসনের সংকটটি এখানে। যে আমলাতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সুশাসনের প্রধান কন্ডাক্টর বা চালক হওয়ার কথা, তারা অনেক সময় নিজেদের আখের গোছানোর এক আত্মঘাতী খেলায় মেতে ওঠেন। যে মানুষের করের টাকায় রাষ্ট্রের চাকা ঘোরে, সেই মানুষ দিন শেষে হয় প্রান্তিক, অবহেলিত। সরকারি দপ্তরের প্রতিটি দরজায় যখন সাধারণ নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য হাত পাততে হয়, তখন বুঝতে হবে শর্ষের ভেতরের ভূত কেবল বেঁচে নেই, সে পুষ্ট হয়ে উঠেছে। আমরা দেখেছি, কীভাবে চাটুকারিতা ও স্তাবকতা সুশাসনকে গ্রাস করে। সম্রাট আকবরের দরবারে যেমন বীরবল ছিলেন সত্য বলার জন্য, আজকের চাটুকার পরিবেষ্টিত ব্যবস্থায় সেই ‘বীরবল’দের বড় আকাল। চারপাশের স্তাবকের দল যখন খলনায়ককে নায়ক বানাতে ব্যস্ত, তখন রাজার পোশাকের নগ্নতা ঢাকার জন্য কোনো সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। সত্যকে আড়াল করার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, তা-ই সুশাসনের পথে বড় অন্তরায়। যখন কোনো দপ্তরে ‘সততা’ হয়ে ওঠে দুর্লভ বিলাসিতা আর দুর্নীতি হয় অলিখিত নিয়ম, তখন বুঝতে হবে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পুরো ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভূত ঢূকে পড়েছে। এর পরিবর্তন করতে হলে, কেবল লোক দেখানো বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মতো ‘আইওয়াশ’ দিয়ে কাজ হবে না। ক্যানসারের ক্ষতকে যেমন সুগন্ধি দিয়ে ঢাকা যায় না, তেমনি সুশাসনের অভাবকে মেগা প্রজেক্টের ঝকমকে আলো দিয়ে আড়াল করা যাবে না।

দুর্নীতি আর অন্যায়ের অন্ধকার দূর করার বড় হাতিয়ার হলো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কিন্তু এই রূপান্তর কি এতটাই সহজ? যখন প্রাতিষ্ঠানিক ওঝারা ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিক সমাজকেই জেগে উঠতে হয়। নাগরিকরা যখন নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হবেন, যখন অন্যায় দেখে ‘আমার কী’ বলে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শিখবেন, তখনই শর্ষের ভেতরের ভূত কাঁপতে শুরু করবে। ‘সুশাসন’ আকাশ থেকে পড়া কোনো পরশপাথর নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চা ও সংস্কৃতির নাম।  ‘শর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে?’ এর উত্তর দুরবিনে খোঁজার প্রয়োজন নেই। উত্তর আছে সম্মিলিত সদিচ্ছা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নাগরিকদের বিবেকের মধ্যে। সর্ষে ক্ষেতকে ভূতমুক্ত করতে হলে সমাজ থেকে ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে হবে। যতক্ষণ না ক্ষুদ্রতম কণ্ঠস্বরটিও নির্ভয়ে দাবি জানাতে পারে, ততক্ষণ সুশাসনের স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। আসুন, আমরাই ওঝা হয়ে ওঠি, যে নিজের ভেতরের লোভ আর ভয়ের ভূতকে তাড়িয়ে নিজেকে শুদ্ধ করবে, আর সমাজকে দেবে সুশাসনের হাওয়া। কারণ, এই মাটি আমাদের। একে বাসযোগ্য করার দায় আমাদেরই।  অন্যায়কে ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেওয়ার যে মজ্জাগত অভ্যাস আমরা গড়ে তুলেছি, তা-ই মূলত শর্ষের ভেতরের ভূতকে দিন দিন আরও শক্তিশালী, দুঃসাহসী করে তুলেছে। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যারা রক্ষকের তকমা গায়ে জড়িয়ে ভক্ষকের উল্লাসে মেতে ওঠেন, তারা ভুলে যান, ইতিহাসের আদালত বড় নির্মম সেখানে একদিন হিসাবের খাতা খুলে বসতে হয়। আমাদের সেই মোহের দেয়াল ভাঙতে হবে। যেদিন দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে শিখবে; যেদিন টেবিলের নিচের লেনদেনকে সমাজ অবজ্ঞা আর ঘৃণার চোখে দেখবে; সেদিনই এই অদৃশ্য ভূত নিজের খোলস গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হবে। সুশাসন কেবল সংবিধানে লিখে রাখা কিছু শীতল অনুচ্ছেদ নয়, সুশাসন হলো সামাজিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি যখন শাসকের হৃদয়ে থাকবে দেশপ্রেম আর নাগরিকদের থাকবে অধিকারের অঙ্গীকার হয়ে। শতাব্দীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, শর্ষের ভেতরের ভূত তাড়ানোর মন্ত্র উচ্চারিত হোক সম্মিলিত কণ্ঠে। যখন ভয়ের সংস্কৃতি পেরিয়ে প্রতি কণ্ঠস্বর গেয়ে উঠবে ন্যায়ের গান, তখনই অবসান ঘটবে এই দীর্ঘ শোষণ আর অন্যায়ের, প্রতিষ্ঠিত হবে সুশাসন।

লেখক : প্রকৌশলী ও সাংবাদিক

jewelrupalibd@gmail.com