সংরক্ষিত বন 

প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় অভিঘাত নয়

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:২৬ এএম

প্রকৃতি ও বনভূমি আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। অরণ্য রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘গাছেরা হলো পৃথিবীর অন্তহীন আর্তনাদ, যা শোনার জন্য আকাশ কান পেতে থাকে।’ আর স্কটিশ-বংশোদ্ভূত  আমেরিকান প্রকৃতিবিদ, লেখক এবং পরিবেশবাদী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থার জনক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত জন মু্যুর বলেছেন, ‘মহাবিশ্বের গভীরে প্রবেশ করার সবচেয়ে পরিষ্কার পথ হলো বনের বন্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া।’ তাদের এমন মন্তব্যে খুব সহজেই প্রতীয়মান হয় বন সংরক্ষণের গুরুত্ব কতটা। সংরক্ষিত বনের তো রয়েছে আরও বেশি গুরুত্ব ও ভিন্নতা। কিন্তু বন বিভাগের লিখিত নিষেধাজ্ঞা ও লাল নোটিস উপেক্ষা ও  নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে দেশের অন্যতম স্পর্শকাতর ও বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র কক্সবাজারের টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বুক চিরে কীভাবে নির্মিত হচ্ছে পাকা সুউচ্চ সীমানাপ্রাচীর, এটি জরুরি প্রশ্ন। ‘টেকনাফের সংরক্ষিত বনে উঁচু সীমানাপ্রাচীর’ শিরোনামে ২১ জুন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘টেকনাফ রেঞ্জের মুছনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগান এলাকায় (২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন) এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অজুহাতে প্রায় ১ হাজার ফুট দীর্ঘ এবং ১০ ফুট উচ্চতার এই বিশাল প্রাচীর নির্মাণ হচ্ছে।’ আমরা জানি, এ ধরনের প্রকল্প প্রণয়ন-বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর সঙ্গে পর্যালোচনা, প্রকল্প প্রণয়ন-বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা-সমীক্ষার পাশাপাশি তাদের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তাদের অন্ধকারে রেখে এমন স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কাজ কীভাবে চলছে? এর ফলে বনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকির সৃষ্টি হয়েছে এবং তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমাদের অধিকাংশ বনাঞ্চলে নানাভাবে চলছে আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড। সংরক্ষিত বনগুলোর অরক্ষিত চিত্রও দৃশ্যমান হচ্ছে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘টেকনাফ রেঞ্জের মুছনী বিটের শালবাগান ও ন্যাচার পার্কসংলগ্ন এই বনাঞ্চলটি প্রায় ২৮৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির আদি আবাসস্থল। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাড়তি চাপে এমনিতেই বনের পরিবেশ বিপন্ন, তার ওপর এই কংক্রিটের দেওয়াল বন্যপ্রাণীর অবশিষ্ট শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস করে দেবে।’ বিভিন্ন বিভাগের কাজে  সমন্বয়হীনতা কিংবা এখতিয়ারবহির্ভূূত অথবা অযাচিত হস্তক্ষেপের অনেক নজিরই আমাদের সামনে রয়েছে। আমরা মনে করি, তাতে শুধু নিয়মনীতিরই লঙ্ঘন ঘটে না বহুমাত্রিক জটিলতার সৃষ্টি হয়, স্ফীত হয় ক্ষতির চিত্রও। অভিযোগ আছে, দেশের সংরক্ষিত বন রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ ও আইন জোরদার করা হলেও, বাস্তবায়ন-ঘাটতির কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে রয়েছে। বন্যপ্রাণী ও বৃক্ষের সুরক্ষা  শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয় বরং টেকসই উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তন সংকটসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং কতিপয় মানুষের নানাবিধ অত্যাচারে দেশের অনেক বনেই বহু প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা যেমন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি তেমনি বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও বনাঞ্চলের নীতিমালা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একটি বন সহজে গড়ে ওঠে না, কিন্তু অনায়াসে ধ্বংস করা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছেও। দেশে ক্রমেই প্রাকৃতিক বন সীমিত হয়ে আসছে। এটা হচ্ছে মূলত অপরিণামদর্শীদের অনাকাক্সিক্ষত কর্মকাণ্ডের ফলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবেও বন ধ্বংস করা হয়, এমন অভিযোগও কম নয়। সংরক্ষিত বনে অবাধে বসছে স্থাপনা, এও কোনো নতুন খবর নয়। প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও বনের সুরক্ষায় নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে টেকনাফের সংরক্ষিত বনে কীভাবে সীমানাপ্রাচীর তৈরি হচ্ছে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রলালয় ও দপ্তরের। নীতিমালা লঙ্ঘনের যথাযথ প্রতিবিধানের দায়ও তাদেরই। দেশের বনাঞ্চলগুলো হুমকির মুখে। এক সময় বনাঞ্চলগুলোর যে পরিবেশ-ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সম্পদ ছিল, তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।  সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প বা স্থাপনায় গ্রাস করেছে অনেক এলাকা। দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর অন্যতম একটি বন কক্সবাজারের টেকনাফের সংরক্ষিত বনটি। ইতিমধ্যে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি বনে। এসবই দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতার উৎকট চিত্র। আমরা আশা করব, টেকনাফের সংরক্ষিত বনের বুকে অভিঘাতের প্রতিবিধান হবে দ্রুত এবং খতিয়ে দেখা হবে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও। বনটির সুরক্ষায় কোনো উদাসীনতা কাম্য নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত