বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শীর্ষ বৈঠক আজ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুরের অদূরে পুত্রাজায়ায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে তারেক রহমান পুত্রাজায়া পৌঁছালে আনোয়ার ইব্রাহিম রাষ্ট্রীয় অতিথিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাবেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ কুয়ালালামপুর পৌঁছান। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সুসজ্জিত বাহিনীর দেওয়া গার্ড অব অনারের সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। ভিভিআইপি টার্মিনালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান এবং তার সহধর্মিণী। ছোট শিশু মাইসা নুর আইশা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জুবাইদা রহমানকে। এ সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী ও ডেপুটি হাইকমিশনার সাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুই সরকারপ্রধান শুরুতে একান্ত বৈঠকে বসবেন। এরপর প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও অনিয়মিত হয়ে পড়া কর্মীদের নিয়মিত করা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জ¦ালানি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় আসবে। আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে। বৈঠকের পর দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। মালয়েশিয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও তারেক রহমানের বৈঠকের কথা রয়েছে।

এদিকে তারেক রহমান গত রাতে মালয়েশিয়া বিএনপি ও দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবশেষ ২০১৪ সালে মালয়েশিয়ায় তিনি ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে দেখতে এসেছিলেন। মালয়েশিয়ার রাস্তাঘাট খুবই পরিষ্কার। এই পরিষ্কার আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরাও করছে। বিদেশে এত পরিষ্কার করতে পারলে দেশে কেন পারব না। তিনি বলেন, আমি যখন নির্বাচিত হই তখন প্রথম দিকেই মালয়েশিয়া সরকারের প্রধান ড. আনোয়ার ইব্রাহিম ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আমাকে তার দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সোমবার (আজ) তার সঙ্গে বৈঠক হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলোচনা কী হবে এটা নিয়ে বেশ কৌতূহল আছে সবার। প্রথমেই এখানে বহু শ্রমিক কাজ করছে। শ্রমবাজার কীভাবে আবার খুলতে পারি তা মূল আলোচনায় থাকবে। নানা কারণে ২ হাজারের মতো মানুষ মালয়েশিয়ায় আটকে আছে তাদের কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেই পথ খোঁজা হবে।

মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী নিয়োগব্যবস্থা। প্রবাসীদের আশা, এ সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার সুযোগসহ নানা বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কুয়ালালামপুরে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিক নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই দেশের সরকার যদি সরাসরি ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করে, তাহলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে মালয়েশিয়ায় আসার সুযোগ পাবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি। আরেক প্রবাসী জাকারিয়া বলেন, কলিং ভিসা চালু হলেও যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না।

স্থানীয় ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গবেষক আলমগীর চৌধুরী আকাশ বলেন, আমরা চাই দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হোক। ব্যবসায়ী মহল আশা করছে, সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। হালাল শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া অবৈধভাবে বসবাসের কারণে কারাগারে থাকা কিছু বাংলাদেশি প্রবাসীকে মুক্ত করে কীভাবে দেশে পাঠানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

বিএনপির মালয়েশিয়া ইউনিটের সহসভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং দেশটিতে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এ সফরে কুয়ালালামপুর এসেছেন।

তারেক রহমান আজ সোমবার বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বন্দরনগর দালিয়ানে যাবেন। আগামীকাল ২৩ জুন থেকে ২৬ জুন চীনে তার রাষ্ট্রীয় সফর অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আগামী ২৬ জুন বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম প্রমুখ। অন্যদের মধ্যে আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।