১৪ বছর আগে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে গুমের বিষয়ে জবানবন্দিতে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন সাক্ষী সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। গতকাল রবিবার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। ইমরুল কায়েস এ মামলার পঞ্চম সাক্ষী। জবানবন্দির সময় আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মার্ড কোরে যোগ দেন। এরপর ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেড কোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন তিনি। র্যাব ইন্টেলিজেন্সে ‘রানার’ হিসেবে নিয়োগ পান। এ সময় তিনি জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকতেন। তার কাজ ছিল সব সময় জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকা।
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে, তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দিই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে যাই।’ সাক্ষী বলেন, ‘ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে ইলিয়াস আলী নামের একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে (২৩ এপ্রিল) আমি কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন।’
জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকাবস্থায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে সাক্ষী ইমরুল কায়েস বলেন, ‘ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল এলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক) ফোন দিয়েছেন।’ জিয়া স্যার তারেক স্যারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। অপর প্রান্তে কী বলেছে, আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে? এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায়ে দেন, এটাই আমার ভালো।’
একই বছরের আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের (জিয়াউল আহসান) নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত-পা বাঁধা এবং মাথায় জম টুপি পরানো ছিল। রাত আনুমানিক ২টা আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌঁছাই। সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪/৫ জন লোক এসে তাদের আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করি। জাফলং বর্ডার থেকে আনুমানিক ২৫/৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। এবং জিয়াউল আহসান স্যার তাকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন।’ ইমরুল কায়েস বলেন, ‘ওই সময় স্যারের নির্দেশে আমি এবং অন্য একজন গাড়ির সামনে এবং পেছনে সিকিউরিটি হিসেবে দাঁড়াই। অন্য আসামিকে নিয়ে রওনা করে ১০/১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে তাকে জিয়াউল আহসান স্যার হত্যা করেন।’