মামলাজট

দ্রুত ও ন্যায়বিচার স্থায়ী নীতি হোক

ব্রিটিশ সরকারপ্রধান যিনি চারবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সেই উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন বলেছিলেন, ‘বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা।’ আমরা জানি, রাষ্ট্র-সমাজে বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির অধিকার রাখে এবং তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা  মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির দাবি নানা মহল থেকে বারবার উঠলেও এক্ষেত্রে  অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। ২২ জুন ‘দিনে ৩৪০০ মামলা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মামলাজটের প্রকট চিত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেড় দশকের কিছু বেশি সময় পর মামলা বেড়ে এখন তিনগুণ অর্থাৎ প্রায় ৪৮ লাখ এবং গত ৬ বছরে দিনে গড়ে মামলা রুজু  হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার করে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে গত মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন মামলা ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩, হাইকোর্টে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬ মামলা বিচারাধীন। আর অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২।’ এই চিত্র সাক্ষ্য দেয়, পাহাড়সম মামলার বিচারপ্রার্থীরা কতটা বিড়ম্বনার শিকার এবং একই সঙ্গে বিলম্বিত বিচারের কারণে তাদের অধিকারের পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ।

কেন এই পরিস্থিতির নিরসন করা যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের নানা রকম ব্যাখ্যা মেলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের তরফে। বিচারক সংকট, আদালতের পরিসর চাহিদা অনুপাতে কম, সমাজে অপরাধ বাড়ছে, জনসংখ্যার আধিক্যে, সামাজিক বিরোধের ঊর্ধ্বমুখী হার, আইন ভাঙার প্রবণতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা অভিযোগে মামলা, আইনের শাসনের ঘাটতি, একটির পর একটি আইনি ধাপ অতিক্রমে বহুবিধ জটিলতাসহ আরও অনেক কারণেই মামলার স্তূপ ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। এমতাবস্থায় মামলার জট দেশের আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে সংবাদমাধ্যমে উচ্চআদালত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয় , প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামলা নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তার সক্রিয় উদ্যোগের ফলে দায়িত্ব নেওয়ার আড়াই মাসের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রায় ৪ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা বিচারব্যবস্থায় গতি ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। একইভাবে নিম্ন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদেরও এজলাসের সময় সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের স্মরণে আছে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জানিয়েছিলেন দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। গৃহীত পদক্ষেপগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। বিচার বিলম্বের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, বিচারব্যবস্থায় কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত উভয় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা জানি , মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইন সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ করা হয়। এর লক্ষ্য সমন জারির ক্ষেত্রে এসএমএস ও ভয়েস কল ব্যবহারের বিধান যুক্ত হওয়ায় প্রথাগত পদ্ধতির বিলম্ব হ্রাস করা। আমরা এও জানি, এফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল, সরাসরি জেরা এবং ডিক্রি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। কিন্তু এর সমান্তরালে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ায় পলাতক আসামির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া পরিহার, ডিজিটাল সমন জারি এবং বিচার প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুফল কেন কাক্সিক্ষত মাত্রায় মিলছে না, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, শুধু ব্যবস্থা নিলেই কিংবা অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিতে এর সমাধান হবে না এ জন্য জরুরি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকি। একই সঙ্গে বিচারক এবং এজলাস সংকট নিরসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব-কর্তব্য পালনও জরুরি। একটি দেশের সরকারের সাফল্য তার ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় এই সত্য এড়ানোর অবকাশ নেই। মহাত্মা গান্ধী যথার্থই বলেছেন, ‘প্রকৃত শান্তি নির্ভর করে শুধুমাত্র উত্তেজনার অনুপস্থিতিতে নয়, এটি নির্ভর করে ন্যায়বিচারের উপস্থিতির ওপর।’ আমরা চাই,  দ্রুত ও ন্যায়বিচার সমাজের স্থায়ী নীতি হোক।