শুভ জন্মদিন, স্যার

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে অর্থনীতি পড়ুক। ছেলের আগ্রহ সাহিত্যে। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে ছেলের দূরত্ব তৈরি হলো। ছেলে ভর্তি হলেন ইংরেজি সাহিত্যে। বাবা মেনে নিলেন। পরে বাবার ইচ্ছে ছিল সিভিল সার্ভিসে গিয়ে বড় কর্মকর্তা হবেন ছেলে। কিন্তু ছেলে গেলেন শিক্ষকতায়। সেই ছেলে একদিন বাঙালি জাতির শিক্ষকে পরিণত হলেন। তার নাম অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সবার কাছে তিনি ‘সিক স্যার’। আজ ২৩ জুন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপকের ৯১তম জন্মদিন।  এ উপলক্ষে আজ বিকেল ৫টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে তিনি একটি একক বক্তব্য দেবেন। শিরোনাম ‘কী দেখেছি, কী বুঝেছি’।

দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৬ সালে তৎকালীন বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে। তার বাবার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মায়ের নাম আছিয়া খাতুন। বাবার চাকরিসূত্রে তার শৈশব কাটে রাজশাহী ও কলকাতায়। কিছু সময় কাটে পৈতৃক বাড়ি বিক্রমপুরে। তিনি পড়াশোনা করেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটর ডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। বায়ান্নর উত্তাল সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৭ সালে তিনি একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তার স্ত্রী লেখিকা নাজমা জেসমিন চৌধুরী বহু আগেই প্রয়াত। দুই মেয়ে রওনক আরা চৌধুরী ও শারমীন চৌধুরী।

মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নতুন দিগন্ত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি এখনো পত্রিকাটি সম্পাদনা করে চলছেন। এর আগে তিনি সম্পাদনা করেছেন পরিক্রমা, সাহিত্যপত্র, সচিত্র সময়, সাপ্তাহিক সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকাসহ নানা পত্রিকা। আশির দশকে দৈনিক সংবাদ-এ ‘গাছপাথর’ ছদ্মনামে নিয়মিত কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনামের এই কলামটি প্রতি মঙ্গলবার প্রকাশিত হতো। তার এই কলাম পড়ার জন্য তখনকার পাঠক উন্মুখ হয়ে থাকতেন। দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতিহীনভাবে তিনি এই কলাম লিখেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। বেশিরভাগই চিন্তাশীল প্রবন্ধ। গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন কয়েকটা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখালেখি শুরু করেন স্কুলে পড়ার সময়। তার প্রথম লেখা ছাপা হয় মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়, তখন তিনি ক্লাস টেনে পড়েন। তার প্রথম লেখাটি ছিল মোপাসাঁর গল্পের অনুবাদ। তার লেখা প্রথম বই ছোটদের শেকসপিয়ার। ৬৪ পৃষ্ঠার এই জীবনীগ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল আহমদ পাবলিশিং হাউস। তার দ্বিতীয় বই অন্বেষণ প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। এরপর থেকে তিনি একটানা লিখে যাচ্ছেন। লেখালেখিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে পান একুশে পদক।

শিক্ষক হবেন শৈশবে এমনটি ভাবেননি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। লেখালেখি করবেনএমনটাও তার ভাবনার মধ্যে ছিল না। তবে একটা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হলো। তিনি যখন ক্লাস সেভেনে পড়েন তখন ফুটবল খেলতে গিয়ে তার পা ভেঙে যায়। দেড় মাসের বেশি সময় তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। তার পা প্লাস্টার করা ছিল। প্লাস্টার খোলার পরও তিনি হাঁটতে পারছিলেন না। ওই সময় রাজশাহীতে ভালো একটা পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। তার বাবা ওই লাইব্রেরি থেকে ছেলের জন্য বই নিয়ে আসতেন। এ ছাড়া বাড়িতে নিয়মিত আসত দৈনিক আজাদ, মোহাম্মদী ও শিশুসাথী। অসুস্থ শরীরে ঘরে শুয়ে বসে বই আর সাময়িকপত্র পড়তে পড়তেই সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগটা বাড়ল।

লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা, সম্পাদনা ও শিক্ষকতা তাকে আনন্দ দিয়েছে। তাই সারা জীবন তিনি এসব কাে জই বুদ হয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, তার দুটো সত্তালেখক ও শিক্ষক। এই দুই পরিচয়ের বিরোধ ঘটেনি কখনো।

বৃত্ত ভাঙার পরিকল্পনা নিয়ে সারা জীবন লেখালেখি করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সমাজের বৃত্ত তিনি কতটা ভাঙতে পেরেছেনসেটা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে তিনি তার চেষ্টা থেকে বিচ্যুত হননি। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, জীবনের নানা ঘটনা। মৃত্যু নিয়েও  কথা বলেছেন তিনি ‘আমি এত দূরে ভাবি না। যা হওয়ার তাই হবে। আমি কাজের মধ্যেই আছি। প্রতিদিনের কাজটাই আমার কাছে বড়। এর মধ্য দিয়েই সময় কেটে যায়...।’