লিওনেল মেসিকে আটকে রাখবে কে? পেনাল্টি মিস করেছেন। কিন্তু গোল করেছেন দুটি ঠিকই। আরেকটু হলে হ্যাটট্রিক করে ফেলতেন। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিসের চরম আক্ষেপ ভুলে ডালাসের মাঠে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আবারও রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন এ আর্জেন্টাইন জাদুকর। খলনায়ক থেকে এক ম্যাচেই দুবার নায়ক বনে গিয়ে ফুটবলবিশ্বকে দেখালেন কেন তিনি অনন্য। তার জাদুকরী জোড়া গোলেই অস্ট্রিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব ৩২’ (নকআউট পর্ব) নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে নিজের গোল সংখ্যাকে নিয়ে গেছেন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায়।
ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুতেই চরম নাটকীয়তা ছড়ায়। ম্যাচের ৩ মিনিটে অস্ট্রিয়ান ডিফেন্সের ভুলে ডি-বক্সে বল পেয়ে যান লাউতারো মার্তিনেস, কিন্তু অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডার তাকে অবৈধভাবে ফাউল করলে ভিএআরের সাহায্য নিয়ে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ৭ম মিনিটে জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে স্পট-কিক নিতে আসেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তবে তার দুর্বল ও লক্ষ্যভ্রষ্ট শটটি পোস্টের বাইরে চলে গেলে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম। এটি ছিল মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের রেকর্ড তৃতীয় পেনাল্টি মিস।
পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া তাদের চেনা হাইপ্রেসিং ও কমপ্যাক্ট মিডফিল্ড দিয়ে কোণঠাসা করে রেখেছিল আলবিসেলেস্তদের। কিন্তু ম্যাচের ৩৮ মিনিটে দেখা মেলে বহুল কাক্সিক্ষত ‘মেসি ম্যাজিক’-এর।
বাম প্রান্ত থেকে ডিফেন্ডার ফাকুন্দো মেদিনা বক্সের ভেতর একটি নিচু ক্রস বাড়ান। সেখানে থাকা থিয়াগো আলমাদা দারুণ বুদ্ধিমত্তায় বলটি নিজে না খেলে ডামি করে (ছেড়ে দিয়ে) পেছনে থাকা মেসির দিকে বাড়িয়ে দেন। কোনো ভুল করেননি এলএমটেন; চোখের পলকে বাম পায়ের ক্লিনিক্যাল ফিনিশে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি। এ গোলের মাধ্যমে মিরোসøাভ ক্লোসাকে টপকে ১৭ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান মেসি।
১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধে বেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল শুরু করে অস্ট্রিয়া। নিজেদের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা মার্সেল সাবিৎজার ও লাইমারের জুটি বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে ফাটল ধরার চেষ্টা করছিল। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে সাবিৎজারের একটি বুলেট গতির শট দুর্দান্তভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনার লিড ধরে রাখেন গোলরক্ষক এমি মার্তিনেস।
ম্যাচের ৬০ মিনিটের পর ম্যাচের গতি বাড়াতে মাঠে হুলিয়ান আলভারেস ও নিকো গনজালেসকে নামান লিওনেল স্কালোনি। ৭৩ মিনিটে মেসির বাঁকানো কর্নার থেকে নিকো গনজালেসের নেওয়া চমৎকার হেডটি পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।
ম্যাচ যখন একদম শেষ মুহূর্তে, অস্ট্রিয়া যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ে (৯০+৫ মিনিটে) আবারও জ্বলে উঠলেন ফুটবল ঈশ্বর। অস্ট্রিয়ার ডি-বক্সে প্রথমে হুলিয়ান আলভারেসের জোরালো শট প্রতিহত হয়, এরপর মেসির নিজের একটি প্রচেষ্টাও রুখে দেয় অস্ট্রিয়ান ডিফেন্স। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নন মেসি; জটলার ভেতর থেকে দারুণ এক কায়দায় বল অস্ট্রিয়ার জালে জড়িয়ে দেন তিনি।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের গোল সংখ্যাকে ১৮-তে নিয়ে গেলেন মেসি। অবিশ্বাস্য এক পরিসংখ্যানের জন্ম দিয়ে ধারাভাষ্যকাররা তখন চিৎকার করে বলছিলেন ‘আপনি এই মানুষটিকে কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারবেন না! এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত ৫টি গোল করেছে এবং তার প্রতিটি গোলই এসেছে লিওনেল মেসির পা থেকে!’
শেষ দিকে ফ্রি-কিক থেকে আরেকটু হলে আরেকটি গোল পেয়ে যেতে পারতেন। পোস্ট মিস করায় মেসিকে সতীর্থদের বলতে দেখা যায় হলো না তো।
টান টান উত্তেজনার ছক পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। এই জয়ে ২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জে’-এর শীর্ষস্থান মজবুত করার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের পরের রাউন্ডের টিকিট কাটল তিন তারকার আর্জেন্টিনা।