ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের পদত্যাগ

নিজ দলের আইনপ্রণেতাদের তীব্র চাপের মুখে অবশেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদ ও ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। গত কয়েক মাস ধরে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে যে সংকট ঘনীভূত হয়েছিল, এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সে গুঞ্জনের যবনিকাপাত ঘটল। গতকাল সোমবার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে এক বিবৃতিতে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার। এ সময় তিনি বলেন, ‘আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি কি না, এখন সেই প্রশ্নই তুলছে আমার দল।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংসদীয় দলের সেই প্রশ্নের জবাব আমি পেয়েছি এবং সসম্মানে তা মেনেও নিচ্ছি। ক্ষমতায় থাকাকালীন আমার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের লক্ষ্যই ছিল নিজের দেশকে সবার আগে রাখা। সেই কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে ইস্তফা দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ব্রিটেনের রাজা চার্লসকে আমার এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি।’

বক্তব্যের শেষের দিকে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী। সব পরিস্থিতিতে ঢাল হয়ে পাশে থাকার জন্য স্ত্রী লেডি ভিক্টোরিয়া স্টারমারকে ধন্যবাদ জানান তিনি। স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার ফলে গত সাত বছরে এ নিয়ে ষষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান পেতে চলেছে যুক্তরাজ্য। বিদায়ী ভাষণে কিয়ার স্টারমার বলেন, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য তিনি দলকে অনুরোধ করবেন। আগামী ৯ জুলাই থেকে এ পদের জন্য মনোনয়ন জমা নেওয়া শুরু হতে পারে। তার কয়েক সপ্তাহ পরেই গ্রীষ্মকালীন অবকাশের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত হয়ে যাবে। স্টারমার বলেন, ভোট প্রক্রিয়া শুরু হলে আগামী সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্টের অধিবেশন পুনরায় চালু হওয়ার আগেই নতুন নেতা নির্বাচন পর্ব সম্পন্ন হয়ে যাবে। পাশাপাশি পরবর্তী নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান দেন স্টারমার।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলের নজর এখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দিকে। গত শুক্রবার মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জিতে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম পার্লামেন্টে ফিরে আসেন, যা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ সুগম করে দিয়েছে। লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার ও দলের ‘উত্তরসূরি’ হিসেবে তার নাম উঠে আসছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। দলের অন্য কোনো বর্ষীয়ান নেতাও এ দৌড়ে শামিল হতে পারেন। গত সপ্তাহেও স্টারমার তার পদে টিকে থাকার এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনমনীয় ছিলেন। বেশ কিছু কেলেঙ্কারি এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক পদত্যাগের পর তার ও লেবার পার্টির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হলেও তিনি গত কয়েক মাস ধরে নিজের অবস্থানে অবিচল ছিলেন। তবে যুক্তরাজ্যের সবশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভরাডুবির পর ক্রমশ জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন স্টারমার।

২০২৪ সালে দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টিকে একটি নির্বাচনে জয়ী দলে রূপান্তর করার কৃতিত্ব স্টারমারকে দেওয়া হয়। তবে ভাতা কর্তন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত তার জনপ্রিয়তা হারানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এর আগে গত মার্চ মাসে প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের পরিচিত সহযোগী পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রায় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মুখে পড়েছিলেন। পাশাপাশি অতি-ডানপন্থি এবং অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকের দ্রুত উত্থান ঠেকাতেও হিমশিম খেয়েছেন স্টারমার। পদত্যাগের ভাষণে স্টারমার আরও বলেন, ‘আমি আমার উত্তরসূরিকে পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাব। আমি জানি, দুই বছর আগে আমি যে অবস্থায় ব্রিটেনকে পেয়েছিলাম, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ন্যায্য একটি ব্রিটেন উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে যাচ্ছেন।’