অগ্রগতির দাবি তেহরানের

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আওতায় উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত থামলেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি এখনো দূরের বাতিঘর। যুদ্ধবিরতির প্রথম দফায় নির্ধারিত সময়ে দুই পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর- কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি নতুন সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই এমওইউর শর্ত অনুযায়ী দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্তের সুযোগ পাচ্ছে। গত রবিবার সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারীরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং ট্রাম্পের হামলার হুমকির কারণে আলোচনার শুরুটা বেশ উত্তপ্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। প্রথম দফার এই বৈঠক শেষে অগ্রগতির দাবি করেছে তেহরান।

মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি ‘কর্মপরিকল্পনায়’ সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতি অনুযায়ী, সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষ লেবাননে সংঘাত থামানোর একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতে একটি সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালুর বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রাজি হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ফক্স নিউজ জানায়, ট্রাম্প ইরানের কর্মকর্তাদের এই বলে হুঁশিয়ারি দেন ইরান যদি আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করে, তবে ‘সেই দেশের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না’। ট্রাম্প আরও হুমকি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেবে এবং সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজস্ব কর বা টোল বসাবে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক সূত্রের বরাতে জানায়, ট্রাম্পের হুমকির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ইরানি প্রতিনিধিরা আর আলোচনার কক্ষে ফিরতে রাজি হননি। তবে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত ছিল। এদিকে, সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফার বৈঠকের শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে বলেছেন, ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা তেহরানের বিপুল বাজেয়াপ্ত সম্পদের একাংশও ছাড় করা হয়েছে। লেবানন যুদ্ধ অবসানে বড় অগ্রগতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। এক্সে দেওয়া ওই পোস্টে আরাগচি আরও বলেন, ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে এই বাজেয়াপ্ত সম্পদের পরিমাণ ও পুনর্গঠন পরিকল্পনার বিস্তারিত কিছুই বলা হয়নি ওই পোস্টে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুসারে, গত রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় বিরতিহীন বৈঠক হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে ছিলেন হোয়াইট হাউজের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। আর ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

অন্যদিকে, গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হুমকির জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, ‘আপনি হুমকি দেন; আমরা পদক্ষেপ নেই।’ ধারণা করা হচ্ছে, এটি স্পষ্টভাবে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি আপনার ব্যক্তিগত ক্যাসিনো নয়, কিংবা আধুনিক দিনের জলদস্যুদের পেছনের উঠানও নয়; এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমা, এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের মহান জনগণ এবং তাদের সাহসী সশস্ত্র বাহিনীর।

এ ঘটনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি ইসরায়েলকে অঞ্চল ছাড়া করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গতকাল সোমবার কুদস ফোর্স প্রধান বলেন, ইসরায়েল যদি তাদের আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখে, তাহলে তাদের অপমান ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত করা হবে। যেমনটা ২০০০ সালে দেশটি থেকে তাদের যেভাবে নিঃশর্তভাবে পিছু হটতে হয়েছিল, সেই একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।