দেশের ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিগত সময়ের দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতির ভার সরকারকে বহন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বিশ বছরের রাবিশ তিন মাসে তো আর ক্লিয়ার করতে পারব না। আগামী দুবছর সময় কঠিন যাবে, চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে আমরা সমৃদ্ধির বাংলাদেশ দেখতে পাব।’
গতকাল সোমবার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) অডিটরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘ফিসকাল কম্পাস ২০২৬ : বিয়ন্ড দ্য নাম্বার্স, শেপিং বাংলাদেশ’স ফিউচার, প্রপোজড ন্যাশনাল বাজেট ২০২৬-২০২৭’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএপি বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক ড. এমএ বাকী খলিলী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে শেয়ার বাজার ও ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এখন এর দায় আমাদের বহন করতে হচ্ছে। কাল সকালে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন অঙ্গীকার করতে চাই না। এত বড় দায়ভার নিয়েও আমরা উচ্চাকাক্সক্ষার বাজেট দিয়েছি। দেশের এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীলতায় ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে আমরা সমৃদ্ধির বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাব।
পুঁজিবাজার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেটের জন্যও দুবছর সময় দরকার। এর মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আস্থা ফিরিয়ে আনা। এই লক্ষ্যে আমরা একটি স্বাধীন কমিশন করেছি যারা অরাজনৈতিক এবং পুরোপুরি পেশাদার।
অনুষ্ঠানে ইউএপি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ, অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার মামুন রশীদ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিসিআই) চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চোধুরী (পারভেজ), ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হক, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মোহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার রয়েছে। প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই সবার জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি হবে না। তাই তরুণদের জন্য ডিজিটাল বিশ্বের সুযোগগুলো উন্মুক্ত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন বাণিজ্য, অনলাইন শিক্ষা, কনটেন্ট নির্মাণ ও ডিজাইনিংসহ ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ তহবিলও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতির মূলধারার বাইরে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েগেছে। গ্রামাঞ্চলের কামার, কুমার, তাঁতি, কুটিরশিল্প উদ্যোক্তা রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একইভাবে কাজ করে গেলেও তাদের জীবনমানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। কারণ তারা অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়নি।
তিনি বলেন, শীতলপাটি, মৃৎশিল্পসহ গ্রামবাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনকারীদের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এসব মানুষকে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সরকার আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজারসংযোগের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিকে সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনমানও উন্নত করা সম্ভব হবে।
মূল প্রবন্ধে ইউএপি বিজনেস স্কুলের ডিন এমএ বাকী খলিলী আগামী করবর্ষের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামোর সমালোচনায় বলেন, করের চাপ বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমে। যদি সঞ্চয় না বাড়ে, সম্পদ তৈরি না হয়, তা হলে অর্থনীতির সুদিন ফিরবে না। কারণ সীমিত আয়ের মানুষ তো ভোক্তাও বটে। সেই দিক থেকে এবারের (প্রস্তাবিত বাজেটে) আয়কর কাঠামো সরকার দিয়েছে, তা কিছুটা ইতিবাচক মনে হয়েছে।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে শেয়ারবাজার দাঁড়ায়নি। আসলে দাঁড়াতে না দিলে শেয়ারবাজার দাঁড়াবে কীভাবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য যে প্রণোদনা ছিল, সেগুলো এখন আর নেই। একসময় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ডিভিডেন্ড আয়ে করমুক্ত সুবিধা থাকলেও পরে সেটি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্যও কোনো সুবিধা নেই। বেশি কর মানেই কিন্তু বেশি রাজস্ব আদায় হওয়া না। পৃথিবীর কোনো দেশ এটি প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে এত কর দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কেএম মোজিবুল হক বিশ্ববিদ্যালয় মুনাফা না করায় এখান থেকে করপোরেট করের হার কমানোর অনুরোধ করেন। অন্যথায় আইন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন যাতে যাদের প্রয়োজন তারা মুনাফা করতে পারেন। আর যাদের প্রয়োজন নেই তারা ট্রাস্টিজের মাধ্যমে পরিচালনা করেন।