বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। তার নিয়োগের বৈধতা, মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা গ্রহণ এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বেবিচককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মাহবুবুর রহমান স্বক্ষরিত ১৬ জুন জারি করা এক চিঠিতে বেবিচকের চেয়ারম্যানকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, শরিফুল ইসলাম তার পিতা মো. মোশাররফ হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের ভিত্তিতে ২০০১ সালে বেবিচকে চাকরি পান। তবে ওই সনদের সত্যতা এবং তার পিতার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় বেবিচক, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক তদন্ত চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমির হামজা বলেন, গোপালগঞ্জ জেলার প্রকাশিত ৬৪০ জন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় শরিফুল ইসলামের পিতা মোশাররফ হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান আইনে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধারাই সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকলেও তার নাম গেজেটে না থাকলে তিনি কোনো সরকারি সুবিধা পাবেন না। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তবে এ বিষয়ে এখনো জামুকার কাছে আনুষ্ঠানিক মতামত চায়নি বেবিচক। বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, শরিফুল ইসলামের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র ও অন্যান্য বিষয় যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তদন্ত শেষ হলে জামুকার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাওয়া হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শরিফুল ইসলামের চাকরির সময় জমা দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তার পিতার নাম না থাকায় সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বেবিচকে যোগ দেন এবং বর্তমানে সদর দপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে কর্মরত আছেন। তার পিতার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের ভিত্তিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দিয়েছেন সেটি ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যু করা। ওই সনদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। তবে এ ধরনের সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে সনদের সত্যতা ও বৈধতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে প্রকাশিত গোপালগঞ্জ জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মো. মোশাররফ হোসেন, পিতা মৃত লোকমান মোল্লার নাম পাওয়া যায়নি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেবিচকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে আন্দোলন করেন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। সে সময় শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তার বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বিদেশ সফরের উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে।