বাংলাদেশে প্রবীণদের ওপর নির্যাতন কেবল সচেতনতার আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, বরং এটি প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক দশমাংশ অর্থাৎ এক কোটি ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন ষাটোর্ধ্ব। এই বিপুল সংখ্যক প্রবীণ নাগরিকের মর্যাদা, অধিকার এবং নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে নতুন করে ভাবতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকে।
‘বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতা দিবস’ উপলক্ষে রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক) আয়োজিত এক কনসালটেশন সভায় এই জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আয়োজিত এই সভায় ‘ঢাকা ঘোষণা ২০২৬’-এর মাধ্যমে প্রবীণদের জন্য ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার এবং প্রবীণবান্ধব বিচার ব্যবস্থা প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়।
সভায় বক্তারা প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসা ভাতা ও ওষুধ-পথ্যের ব্যয়ভার বহনের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রবীণ নারীদের সামাজিক সুরক্ষা ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, ২০১৩’ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত ‘প্রবীণ অধিকার আইন’ প্রবর্তনের প্রস্তাব উঠে এসেছে।
২০৫০ সাল নাগাদ দেশের প্রবীণ জনসংখ্যা ২২ থেকে ২৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে তথ্য উপস্থাপন করা হয় সভায়। এমতাবস্থায় প্রবীণ কার্ড চালু, স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করা এবং বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে মানবিক সেবার মান বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের বৃদ্ধাশ্রমের সাথে নিয়মিত সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রবীণদের কল্যাণে সরকার ইতিমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলতি বাজেটে ৬৫ ঊর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য রেলভ্রমণ বিনামূল্যে করা হয়েছে এবং মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিশেষ বয়স্কদের জন্য ভাতার হার আরও বাড়ানো হয়েছে।
তবে আইনমন্ত্রী মনে করেন, কেবল আইনের প্রয়োগ দিয়ে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতন পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। তিনি প্রবীণদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেও সমানভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
রিকের আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিশেষজ্ঞ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রবীণদের সুরক্ষায় দেশজুড়ে হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে ‘প্রবীণ সহায়তা ডেস্ক’ স্থাপনের দাবিটিও জোরালোভাবে উঠে আসে।