খিলক্ষেতে ওয়াসার পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ, বিশুদ্ধ পানির দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ এবং হলদে-বিবর্ণ রঙের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে এই পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে থাকলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বারবার ওয়াসার আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগাযোগ ও অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা না পাওয়ায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসার কাছে গ্রাহকসেবা ও জনস্বাস্থ্যের চেয়ে নিজেদের উদাসীনতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও মহল্লার বাসাবাড়িতে ওয়াসার যে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা সরাসরি পান করা তো দূরের কথা, ফুটিয়ে বা ফিল্টার করেও ব্যবহার যোগ্য করা যাচ্ছে না। লাইন থেকে পানি ছাড়লেই এক ধরণের পচা ড্রেনের মতো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ঘরে। পানির রঙও স্বাভাবিক স্বচ্ছ নয়, বরং স্পষ্টতই হলদেটে ও বিবর্ণ। এই পানি দিয়ে রান্নাবান্না করা, নিত্যদিনের থালাবাসন ধোয়া কিংবা দৈনন্দিন গোসল ও ওজু করার মতো কাজও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে এক নরক যন্ত্রণা ভোগ করছেন হাজার হাজার মানুষ।

​এই চরম অব্যবস্থাপনা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও গঠনমূলক প্রতিবাদ জানিয়েছেন এলাকার নাগরিক ও চিকিৎসক ডা. উম্মে মরিয়ম মিতা। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, পানি মানুষের জীবনের অপর নাম, আর ওয়াসা আমাদের সেই জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হলদে পানি ব্যবহার তো দূর, সাধারণ কোনো কাজে স্পর্শ করারও যোগ্য নয়। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি বলতে পারি, এই দূষিত ও জীবাণুযুক্ত পানি ব্যবহারের কারণে এলাকায় ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এবং মারাত্মক চর্মরোগের মহামারি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা এই পানির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা কি ওয়াসাকে নিয়মিত পানির বিল দেই এই বিষাক্ত পানি কেনার জন্য? জনস্বাস্থ্যের এমন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা ও উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা স্পষ্টত নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। অবিলম্বে এই সংকটের টেকসই ও বৈজ্ঞানিক সমাধান করতে হবে।

​এদিকে ওয়াসার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে চরম ভুক্তভোগী ও ক্ষ্যাপা স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ পারভেজ নিজের বলেন, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। ওয়াসার পানির এখন যে অবস্থা, তাতে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। কল ছাড়লেই মনে হয় ড্রেনের ময়লা পানি সরাসরি ঘরের ভেতর চলে আসছে। দুর্গন্ধের চোটে ঘরে থাকা যায় না, আর পানির কালার পুরো হলদে। এই পানি দিয়ে কি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, নাকি সুস্থ থাকতে পারে? ঢাকা ওয়াসার বিরুদ্ধে তো অভিযোগের কোনো অন্ত নেই, কিন্তু আমাদের মনে হয় এসব অভিযোগ তারা মোটেও তোয়াক্কা করে না। তারা মনে করে আমরা মুখ বুজে সব সহ্য করব। আমরা কি মানুষ নই? ট্যাক্স-বিল সব ঠিকঠাক দেব, আর পানির নামে আমাদের ড্রেনের ময়লা আর বিষ খাওয়ানো হবে, এটা আর সহ্য করা যায় না। আমরা আর কোনো ফাঁকা আশ্বাস শুনতে চাই না। ওয়াসা যদি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করে, তবে আমরা এলাকাবাসী মিলে রাজপথে নেমে তীব্র আন্দোলনে বাধ্য হবো।

​সাধারণ নাগরিকদের এই ক্ষোভ ও ভোগান্তির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকা ওয়াসার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনি কাঠামোর গলদগুলো নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ক্ষুরধার বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নিকুঞ্জ-খিলক্ষেত এলাকার আলোচিত সমাজকর্মী জাহিদ ইকবাল। তিনি অত্যন্ত উত্তপ্ত অথচ অকাট্য যুক্তিতে বলেন, এখানে শুধু পানির রং বদলায়নি, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের চরিত্রও বদলে গেছে। ঢাকা ওয়াসা কি কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নাকি জনগণের করের টাকায় চলা বাণিজ্যিক কোন সংস্থা? প্রতি বছর নিয়ম করে তারা পানির দাম বাড়ায়, কিন্তু সেবার মান বাড়ানোর বিষয়টি ফাইলে আটকে থাকে। নাগরিক সেবার এই চরম বিপর্যয়ের দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। আমরা যদি এক মাস পানির বিল পরিশোধ না করি, ওয়াসা কি কালই আমাদের লাইন কেটে দেবে না? তাহলে যে সংস্থা বছরের পর বছর ধরে একটি পুরো এলাকার মানুষকে বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহ করে জনজীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন দণ্ডবিধির আওতায় ফৌজদারি মামলা হবে না? এটা আর সাধারণ গাফিলতি বা কারিগরি ত্রুটির পর্যায়ে পড়ে না, এটি স্পষ্টত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। জনগণের টেক্স-বিলের টাকা নিয়ে বিনিময়ে যদি রোগ-ব্যাধির লাইসেন্স দেওয়া হয়, তবে সেই জুলুমের জবাব রাজপথেই নির্ধারিত হবে। খিলক্ষেত ও নিকুঞ্জের সচেতন মানুষকে এভাবে আর বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না। ওয়াসাকে মনে রাখতে হবে, জবাবদিহিতাহীন এই স্বেচ্ছাচারিতার দিন এবার শেষ হতে চলল।

​এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৯ অফিসে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ওয়াসার এই দীর্ঘসূত্রতা ও গ্রাহক হয়রানির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে দিন দিন ক্ষোভের আগুন তীব্র হচ্ছে।

​ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর অনেক এলাকাতেই ওয়াসার পাইপলাইনগুলো কয়েক দশকের পুরনো এবং জরাজীর্ণ। অনেক জায়গায় মাটির নিচে থাকা পানির সরবরাহ লাইনে ফাটল ধরেছে, যা পয়ঃবর্জ্যের লাইনের (ড্রেনেজ সিস্টেম) সঙ্গে মিশে পারস্পরিক সংক্রমণ তৈরি করছে। এছাড়া ওয়াসার গভীর নলকূপ বা পাম্পগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটি এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণেও অনেক সময় তলানির কাদামাটি ও রাসায়নিক মিশ্রিত হলদে পানি লাইনে চলে আসে। ওয়াসার নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বারংবার ‘শতভাগ বিশুদ্ধ পানি’র ও ‘সবুজ পানির’ গালভরা আশ্বাস ও ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচারণা চালালেও, খিলক্ষেতের মতো মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভয়াবহ।

​সার্বিক সংকটের বিষয়ে জানতে খিলক্ষেত এলাকার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৯ এর সহকারী প্রকৌশলী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যান। মাঠপর্যায়ের এই চরম ভোগান্তি এবং নিজেদের গাফিলতির কোনো সদুত্তর না দিয়ে এই কর্মকর্তা উল্টো দায় এড়িয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, এ বিষয়ে আমার নির্দিষ্ট করে কিছু বলার নেই। আপনার বা এলাকাবাসীর কোনো তথ্য জানার থাকলে কিংবা কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি কারওয়ান বাজারে ওয়াসার হেড অফিসে যোগাযোগ করুন।

​একটি অতি জরুরি ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের একজন শীর্ষ দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন উদাসীন, অহংকারী ও দায়সারা মন্তব্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের পারদ আরও তুঙ্গে উঠবে বলেই মনে করছে বিশ্লেষকরা। 

খিলক্ষেতবাসীর স্পষ্ট দাবি হেড অফিস কিংবা মডস জোন যেখানেই হোক, ওয়াসাকে অবিলম্বে এই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যথায় এই তীব্র জনরোষ ও সম্ভাব্য কঠোর আন্দোলনের সমস্ত দায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।