জাতীয় বাজেট কেবল রাজস্ব আদায়ের দলিল নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং বিনিয়োগবান্ধব অবস্থানের প্রতিফলন। একটি বাজেটের মাধ্যমে সরকার দেশের কোন খাতকে উৎসাহিত করবে, কোন খাতকে সম্প্রসারিত করবে এবং কোন খাতকে অধিকতর অবদান রাখতে উদ্বুদ্ধ করবে তার সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করে। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা দেশের আবাসন খাত, নগর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মনে করি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী আবাসন খাতকে রাজস্ব আদায়ের একটি সহজ উৎস বা ‘রেভিনিউ মেশিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন একটি খাত, যার সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শত শত শিল্প, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং সরকারের বিপুল রাজস্ব আহরণ জড়িত।
প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। কর কিসের ওপর আরোপ করা হয়? সাধারণত কর আরোপ করা হয় অর্জিত আয়, মুনাফা অথবা বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধার ওপর। কিন্তু জমির মালিক যখন কোনো ডেভেলপারের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি করেন, তখন তিনি কোনো নগদ অর্থ হাতে পান না। সাইনিং মানি বাবদ যে টাকা পান তার ওপর ১৫ শতাংশ কর রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রাপ্তব্য সম্পদের ওপর কর আরোপ করা করনীতির মৌলিক দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কর ব্যবস্থার একটি স্বীকৃত নীতি হলো ‘জবধষরুবফ ওহপড়সব চৎরহপরঢ়ষব’ বা অর্জিত আয়ের ওপর কর। অর্থাৎ আয় বাস্তবে অর্জিত হলে, বিক্রি হলে অথবা নগদে রূপান্তরিত হলে কর আরোপ করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা কার্যত এমন একটি সম্পদের ওপর কর আরোপ করছে, যা বিক্রি হয়নি এবং যার বিপরীতে জমির মালিক কোনো অর্থও পাননি। এটি শুধু অস্বাভাবিক নয়, বরং কর ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আবাসন খাত ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম উচ্চ কর-ভার বহনকারী খাত। অনেকেই মনে করেন ডেভেলপাররা হয়তো কর সুবিধা ভোগ করেন। বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সরকার বিভিন্নভাবে রাজস্ব পেয়ে থাকে। জমির মালিককে প্রদত্ত সাইনিং মানির ওপর বর্তমানে ১৫ শতাংশ মূলধনী ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। জমি নিবন্ধন, নির্মাণসামগ্রী আমদানি ও উৎপাদন, ভ্যাট, উৎসে কর, আয়কর, অনুমোদন ফি, ইউটিলিটি সংযোগ, নকশা অনুমোদনসহ অসংখ্য খাতে সরকার নিয়মিত রাজস্ব আহরণ করে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো, যখন একটি প্রকল্পের শুরু থেকেই সরকার নানাভাবে রাজস্ব পাচ্ছে, তখন একই প্রকল্পে নতুন করে জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের যৌক্তিকতা কোথায়? এই প্রস্তাবের বাস্তব প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা একটি সাধারণ উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়।
ধরা যাক, ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্পে জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পেলেন এবং সেই ফ্ল্যাটগুলোর বাজারমূল্য ১২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তাকে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু কর পরিশোধের জন্য তাকে প্রায় দুটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু তিনি তো কোনো নগদ অর্থ পাননি। তাহলে এই কর তিনি কীভাবে পরিশোধ করবেন?
বাস্তবে এই অতিরিক্ত ব্যয় জমির মালিক ডেভেলপারের ওপর চাপাবেন। ডেভেলপার বাধ্য হয়ে প্রকল্প ব্যয় সমন্বয়ের জন্য ফ্ল্যাটের মূল্য বৃদ্ধি করবেন। আর শেষ পর্যন্ত এই করের প্রকৃত বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতার ওপর। অর্থাৎ এই কর কেবল জমির মালিক বা ডেভেলপারের সমস্যা নয়; এটি দেশের লাখো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে। এমনিতেই নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, জমির উচ্চমূল্য এবং অর্থায়ন ব্যয়ের কারণে ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। নতুন এই কর ফ্ল্যাটের দামকে আরও আকাশচুম্বী করে তুলবে।
এখানেই শেষ নয়। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে যৌথ উন্নয়নভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের নগর উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হলো জমির মালিক ও ডেভেলপারের অংশীদারত্বমূলক উন্নয়ন মডেল। অধিকাংশ জমির মালিকের পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে বহুতল ভবন নির্মাণ সম্ভব নয়। আবার ডেভেলপারদের পক্ষেও প্রতিটি জমি কিনে উন্নয়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে উভয় পক্ষের সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই মডেলই গত চার দশকে দেশের নগরায়ণের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
যদি জমির মালিককে তার প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর বিপুল কর দিতে হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন চুক্তিতে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন। অনেক জমি অনুন্নত অবস্থায় পড়ে থাকবে। পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পুনঃউন্নয়ন বন্ধ হয়ে যাবে। নগর পুনর্গঠন ব্যাহত হবে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে পরিকল্পিত নগরায়ণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিভিত্তিক উন্নয়ন ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু নতুন করের কারণে জমির মালিকরা যদি উন্নয়ন চুক্তিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, তাহলে এই মডেল কার্যত অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এর অর্থ হবে নতুন প্রকল্প কমে যাওয়া, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এই ব্যবসায়িক মডেল নষ্ট হলে ঢাকাসহ সব শহরই নষ্ট হবে। এলোমেলোভাবে ভবন তৈরি হবে অন্য কোনো বিশৃঙ্খল মডেলে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ব্যাহত হবে।
অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন, এই কর সরকারের রাজস্ব বাড়াবে। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। আবাসন খাত এমন একটি বহুগুণক অর্থনৈতিক খাত, যার সঙ্গে ২৬৯টিরও বেশি শিল্প ও উপখাত জড়িত। সিমেন্ট, রড, ইট, কাচ, সিরামিক, টাইলস, পিভিসি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অ্যালুমিনিয়াম, লিফট, পেইন্ট, স্যানিটারি সামগ্রী, আসবাবপত্রসহ অসংখ্য শিল্প এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
একটি প্রকল্প কমে যাওয়া মানে শুধু একটি ভবন কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হচ্ছে সিমেন্ট কারখানায় কম উৎপাদন, রড বিক্রি কমে যাওয়া, টাইলস কারখানার চাহিদা হ্রাস পাওয়া, পরিবহন খাতের আয় কমে যাওয়া এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া। ফলে সরকার যে অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ঞধীরহম ঃযব চৎড়ফঁপঃরাব ইধংব’। অর্থাৎ এমন একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা, যা নিজেই বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ বর্তমানে আবাসন ও অবকাঠামো খাতকে উৎসাহিত করছে, কারণ এ খাত দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। সেখানে বাংলাদেশ যদি উল্টো পথে হাঁটে, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুভ হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই কর আদৌ কতটা ন্যায়সঙ্গত? একজন জমির মালিক যখন নগদ অর্থ পান না, তখন তাকে কাগজে-কলমে নির্ধারিত মূল্যের ভিত্তিতে কর দিতে বাধ্য করা কি যুক্তিযুক্ত? তিনি কি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কর দেবেন? নাকি তার প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের একটি অংশ বিক্রি করে কর দেবেন? যদি তাই হয়, তাহলে এটি কার্যত সম্পদের ওপর আগাম জরিমানার মতোই প্রতীয়মান হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আবাসন সংকটের একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করছে। এ সময়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা শুধু ডেভেলপারদের নয়, বরং জমির মালিক, নির্মাণশ্রমিক, মধ্যবিত্ত পরিবার, উৎপাদন শিল্প এবং সরকারের নিজের রাজস্ব কাঠামোকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
আমরা বিশ্বাস করি, সরকারের উদ্দেশ্য বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করা নয় এবং আবাসন খাতকে সংকুচিত করা নয়। বরং রাজস্ব আহরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সেই কারণেই আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আজকের সিদ্ধান্ত আগামী দশকের নগর উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে। সাময়িক রাজস্বের আশায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আবাসন উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো বিচক্ষণ অর্থনৈতিক নীতি হতে পারে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, মধ্যবিত্তের আবাসন নিরাপত্তার স্বার্থে, কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কর অবিলম্বে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।