ভিনিসিয়ুস ঝড়, রাজপুত্রের ফেরা

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:২১ এএম

মায়ামির স্টেডিয়ামে বুধবার রাতে যেন নামল এক পীত-বসন্ত। গ্যালারির তিন ভাগ জুড়ে তখন ব্রাজিলের হলুদ সমুদ্র। সাও পাওলোর উচ্চ-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে মাঠের টানে ছুটে আসা হাজারো চেনামুখ সবার চোখ তখন সবুজ গালিচায়। টানেলের মুখে খোদ রোনালদিনহোর ম্যাজিক-হাসি আর কোচ কার্লো আনচেলত্তির আলিঙ্গন যেন ম্যাচ শুরুর আগেই লিখে দিচ্ছিল এক মহাকাব্যের ভূমিকা। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে সেলেসাওরা শুধু শেষ বত্রিশই নিশ্চিত করেনি, বিশ্বকে দেখিয়েছে তাদের আক্রমণের এক নতুন দিগন্ত।

কিক অফের বাঁশি বাজতেই বল পায়ে অবাধ্য এক ঝড়ের নাম ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। স্কটল্যান্ডের রাইট ব্যাক নাথান প্যাটারসন হয়তো সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য বলটা কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু ওটুকুই যা সান্ত্বনা! এরপর পুরো ম্যাচজুড়েই চলল ২৫ বছর বয়সী এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকার পায়ের নৃত্য। গতি আর ছন্দের এমন এক প্রদর্শনী তিনি দেখালেন, যা স্কটিশ রক্ষণভাগকে পুরো ম্যাচেই তটস্থ করে রেখেছিল। ১৯৫৮ সালে পেলের পর প্রথম ব্রাজিলীয় হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের খুব কাছাকাছি গিয়েও দুর্ভাগ্যের কারণে তা পাননি ভিনি।

ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৭ মিনিট। স্কটিশ ডিফেন্ডার স্কট ম্যাককেনার এক দৃষ্টিকটু ভুলকে ফিনিক্স পাখির মতোন কেড়ে নিলেন রায়হান, আর সেখান থেকে নিখুঁত পাসে বল বাড়িয়ে দিলেন ভিনির দিকে। জাল কাঁপাতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি এই জাদুকর। প্রথমার্ধেই স্কোরলাইন হয়ে গেল ১-০। এই এক গোলেই যেন আনচেলত্তির দলের ওপর থেকে সব জড়তা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। শিকলছেঁড়া এক শিকারি চিতার মতো মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ালেন ভিনিসিয়ুস। মাঝেমধ্যেই গ্যালারির হলুদ সমুদ্রের দিকে হাত উঁচিয়ে দর্শকদের গর্জনের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। তার প্রতিটি ড্রিবলিংয়ে ছিল স্কটিশদের জন্য এক একটি দীর্ঘশ্বাস।

২২ মিনিটে জ্যাক হেনরিকে বোকা বানিয়ে ভিনিসিয়ুস যখন দ্বিতীয়বার বল জালে জড়ালেন, তখন ভিএআর-এর এক বিতর্কিত ফাউলের সিদ্ধান্তে সেই আনন্দ কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু যার রক্তে সাম্বার ছন্দ, তাকে কি আর নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা যায়? প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে ব্রুনো গিমারায়েসের এক মায়াবী ক্রস যখন স্কটিশ গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গান আর প্যাটারসনকে ফাঁকি দিয়ে বাতাসে ভাসছিল, তখন বাজপাখির মতোন উড়ে এসে নিখুঁত হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি তুলে নেন ভিনি।

গোলটি নিয়ে নাকি একটা বাজি হয়েছিল মিস্টার আনচেলত্তির সঙ্গে। ব্রাজিলীয় কোচ বলেছিলেন, ভিনিসিয়ুস হেডে গোল করবে! সম্ভব না। ভিনি জানিয়েছিলেন, ‘যদি আমি তা করতে পারি তবে তিনি আমাকে একটি বিশেষ উপহার দেবেন। আমি বাজি জিতে গেছি। এখন সেই উপহারের অপেক্ষায় আছি।’

দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের আক্রমণের ধার কমেনি, বরং যোগ হয়েছিল নতুন মাত্রা। মরক্কোর বিরুদ্ধে যে মাতেউস কুনিয়াকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল, তিনিই এখন ব্রাজিলের নাম্বার নাইন জার্সির আসল দাবিদার। হাইতির বিরুদ্ধে জোড়া গোলের পর এদিন স্কটল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন তিনিই। দুজন ডিফেন্ডার আর গোলরক্ষকের সমস্ত প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার করা কোনাকুনি শটটি যখন জালে জড়াল, মায়ামির গ্যালারিতে তখন উল্লাসের সুনামি। এরপর কুনিয়ার সেই ট্রেডমার্ক ‘সার্ফিং’ উদযাপন আর ক্যামেরার সামনে ঝলমলে সাদা দাঁতের হাসি বুঝিয়ে দিল তারকাখ্যাতি কাকে বলে!

তবে এই রূপকথার নেপথ্য কারিগর ছিলেন ব্রুনো গিমারেস। নিউক্যাসেল অধিনায়কের পা থেকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের চেয়ে একজন ক্ল্যাসিক ‘নাম্বার ১০’ ঠিকরে বেরুচ্ছিল বারবার। কুনহার গোলের পেছনে তার সেই জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে প্যাটারসন যখন মাটিতে আছড়ে পড়লেন, আর ব্রুনোর নিখুঁত পাস যখন কুনিয়ার পায়ে পৌঁছাল, তখন মনে হচ্ছিল ফুটবল কোনো খেলা নয়, এক পরম জ্যামিতিক শিল্প।

ম্যাচের ৬০ মিনিট পেরোতেই মাঠের রোমাঞ্চ রূপ নিল এক পরম আবেগে। সাইডলাইনের ধারে গা গরম করতে শুরু করলেন তিনি ব্রাজিল ফুটবলের গত দেড় দশকের ধ্রুবতারা, নেইমার জুনিয়র। গ্যালারি থেকে ভেসে আসতে লাগল এক সুর, এক ধ্বনি ‘নেইমার! নেইমার!’

ইনজুরির কারণে পাঁচ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকা ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। স্বয়ং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টও তাকে খোঁচা দিয়ে ‘ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম’ খেলোয়াড় বলতে ছাড়েননি। কিন্তু সব সমালোচনা, সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ম্যাচের ৭৬ মিনিটে কুনহার বদলি হিসেবে যখন তিনি মাঠে পা রাখলেন, তখন কেটে গেছে দীর্ঘ ৯৮১ দিনের আন্তর্জাতিক নির্বাসন। ২০২৩ সালের শেষের পর এই প্রথম দেশের হয়ে নামলেন তিনি।

৭৯টি আন্তর্জাতিক গোলের মালিকের পা থেকে হয়তো ৮০তম গোলটি এই সংক্ষিপ্ত ক্যামিওতে আসেনি, কিন্তু তার মাঠে থাকাই ছিল দর্শকদের জন্য এক পরম তৃপ্তি। কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য নেইমারের এই ফেরা এক বিশাল স্বস্তি। এক সময় যেখানে ব্রাজিলকে প্রতিটা আক্রমণের জন্য শুধু নেইমারের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হতো, আজ সেখানে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো বিশ্বসেরা সেনানী প্রস্তুত। নেইমার এখন আর ব্রাজিলের একমাত্র ত্রাতা নন, বরং আনচেলত্তির হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের মিশনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও ত্বরিত অস্ত্র।

খেলা শেষে ফুটবলপ্রেমীদের মনজুড়ে কেবল ব্রাজিলের নান্দনিক যুগলবন্দি। এক জুনিয়র (ভিনিসিয়ুস) যখন মায়ামির মাঠ শাসন করছেন, তখন আরেক জুনিয়র (নেইমার) বেঞ্চ থেকে এসে যোগ করছেন অভিজ্ঞতার মহিমায়। পাসিংয়ের গভীরতা, গতির তীব্রতা আর ছন্দের মাদকতায় মায়ামির রাতটি হয়ে রইল একান্তই ব্রাজিলের। এই জয় ব্রাজিলের সেই চিরচেনা ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের পুনর্জন্মের ইশতেহার।

গ্রুপপর্বের বাধা পেরিয়ে ব্রাজিল এখন নকআউট পর্বে। আর সামনে থাকা এই কঠিন লড়াই নিয়ে সতীর্থদের সতর্কবার্তা দিয়ে নেইমার বলেন, ‘মাঠই আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। এখন থেকে ম্যাচে ছোট ছোট ভুলও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। যে দল কম ভুল করবে, তারাই এগিয়ে যাবে। সামনে কঠিন ম্যাচ আসছে, তবে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’

নেইমার ফিরেছেন, আর তার এ প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের হাহাকার ঘোচাতে কতটুকু সাহায্য করে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত