চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যয়ের তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের সাজানো বাগান তছনছ হয়েছে। শুধু পরাজয়ই নয়, দলের অভ্যন্তরীণ চিত্রও বদলেছে। বিধানসভায় নির্বাচিত বিধায়কদের বিদ্রোহের পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট লোকসভার তৃণমূলের এমপিদের মধ্যেও বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। দলের ভাঙন ঠেকাতে ব্যর্থতার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবার দলীয় প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্রোহী নেতারা আগের দিন সোমবার দলীয় চেয়ারপারসনের পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে হাওড়া মধ্য বিধানসভার বিধায়ক ও রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী অরূপ রায়কে নতুন চেয়ারম্যান এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ চারজনকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়।
এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্রোহীরা দলীয় প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’-এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে কি না। এ ঘটনায় মমতাপন্থি নেতারা বিদ্রোহীদের ‘বেইমান’ আখ্যা দিয়ে আট নেতার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রতীক রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। কারণ বিদ্রোহী শিবির ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে নতুন কমিটির তথ্য জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনে নতুন নেতৃত্বের দাবি উত্থাপন করা হলে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকের মালিকানা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই শুরু হতে পারে। এমনকি লোকসভার তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের একটি অংশ ইতিমধ্যে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে যোগ দিলেও, তারা তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী প্রতীকটির দাবিতে সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। অতীতে ত্রিপুরার বিধানসভার নির্বাচনে ‘কলমের নিব’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এনসিপিআই। কিন্তু সেই প্রতীক একেবারেই পছন্দ নয় তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের। গত ১৮ জুন অভিনেত্রী ও সাংসদ শতাব্দী রায়ের কলকাতার বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে ‘ঘাসফুল’ প্রতীক। এর স্রষ্টা হিসাবে বরাবর নিজেকে তুলে ধরেছেন মমতা। যদিও এই নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। আনন্দবাজার বলছে, পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর ঘাসফুল প্রতীকের ছবিটি মমতার আঁকা নয় বলে বিস্ফোরক দাবি করে বসেন সোমনাথ চৌধুরী নামের এক চিত্রশিল্পী। তার দাবি, প্রয়াত এমপি অজিত পাঁজার নির্দেশে ওই লোগো যখন তিনি তৈরি করেন; তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলের জন্ম হয়নি। এক সময় কংগ্রেসের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সোমনাথ।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে মমতাকে বহিষ্কার করে কংগ্রেস। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের নাম আগেই নথিভুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে সেটা ছিল, পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস। পরে পাল্টে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নাম রাখেন মমতা। বিজেপির সঙ্গে জোট করে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকে সে বছর লোকসভা নির্বাচন করে তার দল। তৃণমূলের দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকটির একটি বিশেষ অর্থ আছে। এর মাধ্যমে সমাজের নিচুতলা থেকে শুরু করে আমজনতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফুটিয়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।